বাংলাদেশের প্রাণ ‘সাকিবের সেরা পাঁচ ম্যাচ জেতানো আলোক ঝলমলে ইনিংস’

ফিচার

বহির্বিশ্বে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের নামটি পরিচিতি পাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে ক্রিকেট। দেশে ক্রিকেটের ক্রমবর্ধমান উন্নতি ও ধীরে ধীরে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হয়ে উঠার সম্ভাবনাই আজ বাংলাদেশিদের জন্য গর্বের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন টাইগাররা মাঠে যেকোনো প্রতিপক্ষের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে খেলতে পারে, সুযোগ পেলে বড় মঞ্চে হারিয়ে আসতে পারে বড় বড় দলগুলোকেও। আর দেশীয় ক্রিকেটের আজকের এই অবস্থানে উঠে আসার পিছনে তামিম, সাকিব, মাশরাফি, মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহ – এই পাঁচ তারকার রয়েছে বড় ভূমিকা। তাঁদের ব্যতিক্রমধর্মী মানসিকতা ও অদম্য ইচ্ছা শক্তিই বাংলাদেশের ক্রিকেটকে তার স্বপ্নের চূড়ায় আরোহণের অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে।

আরেক হিসাবে, এই পাঁচ মহিরূহের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অবদান রয়েছে তিন ফর্ম্যাটেরই সাবেক বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের। বিশ্বমঞ্চে একজন আদর্শ প্রতিনিধি হিসেবে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার পাশাপাশি দেশ-বিদেশের প্রতিটি বড় বড় লিগ বা টুর্নামেন্টগুলোয় খেলেছেন তিনি, যেখানে বাংলাদেশের অন্যকারোর নাম পর্যন্ত উঠেনি। এমনকি পরিসংখ্যান বলছে, সর্বশেষ দশকের সেরা অলরাউন্ডারও ছিলেন তিনি। আবার ক্রিকেটের বাইবেল খ্যাত বিখ্যাত সাময়িকী ফোর্বসের এক গবেষণা মতে, চলতি শতাব্দীতে ওয়ানডে ফর্ম্যাটের দ্বিতীয় সেরা ক্রিকেটার হচ্ছেন সাকিব। অন্যদিকে টেস্টেও তিনি রয়েছেন ষষ্ঠ সেরা অবস্থানে। কারণ বাংলাদেশের বহু জয়ের পিছনে ছিল তাঁর একক ভূমিকা। এছাড়া দলের অন্যান্য সিনিয়র ক্রিকেটারদের সঙ্গে মিলে আরো অনেক ম্যাচে দেশবাসীকে শেষ হাসি হাসিয়েছেন তিনি। সেসব ম্যাচ থেকে খুঁজে বের করা সাকিবের সেরা পাঁচ ম্যাচ জেতানো ইনিংস নিম্নে উল্লেখ করা হলো।

শততম টেস্ট জয়

সেবার গলে জয় বাংলা কাপের প্রথম টেস্টে স্বাগতিক শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বড় ব্যবধারে হেরে কিছুটা ব্যাক ফুটে ছিল টাইগাররা। তবে তা নিয়ে মন খারাপ করে বসে থাকার সুযোগও ছিল না। কারণ চারদিন পর আবার মাঠে গড়াবে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট। আর তখন শুধুমাত্র সিরিজ বাঁচানোর লড়াইয়ে নামলেই চলবে না বরং তামিম-সাকিবদের তাড়া করতে হবে নিজেদের শততম টেস্ট জয়ের স্বপ্নকেও। যে কীর্তি এরআগে কেবল অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং পাকিস্তানেরই ছিল।

এদিকে বরাবরের মতো এবারো প্রয়োজনের সময় ঠিকই জ্বলে উঠলেন সাকিব। ৩৩ ওভার বল করে ৮০ রানে ২ উইকেট নিয়ে টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করতে নামা লঙ্কানদের ইনিংস ৩৩৮ রানেই পরিসমাপ্তি ঘটাতে রাখেন বড় ভূমিকা। পরে নিজেদের প্রথম ইনিংসেও ৭২.৯৬ স্ট্রাইক রেটে মাত্র ১৫৯ বলেই ১১৬ রানের দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে বাংলাদেশকে ১২৯ রানের বড় লিড পাইয়ে দিতে সাহায্য করেন। আবার দ্বিতীয় ইনিংসেও দুরন্ত সাকিবের আঘাতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি স্বাগতিকরা। মাত্র ২.০৪ ইকোনমি রেটে ৪ উইকেট শিকার করে বাংলাদেশকে ঐতিহাসিক মাইলফলকের আরো কাছে নিয়ে যান তিনি। অবশ্য দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট হাতে তেমন একটা প্রভাব রাখতে না পারলেও, সতীর্থদের ইতিবাচক ব্যাটিংয়ে ৪ উইকেট হাতে রেখেই কলম্বো টেস্টটিতে জয়ের দেখা পেয়ে যান টাইগাররা। আর নিজেদের ইতিহাসের শততম টেস্ট জয়ী চতুর্থ দল হিসেবে রেকর্ড বুকে এসে হয়ে যায় লাল-সবুজের বাংলাদেশের নাম।

চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেই অবিশ্বাস্য জয়

এবারের সমীকরণটা বেশ জটিল ছিল। ২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনালে উঠার জন্য বাংলাদেশকে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি সৃষ্টিকর্তার কাছে এটাও দোয়া করতে হয়েছিল যাতে পরেরদিন ইংলিশরাও অস্ট্রেলিয়ানদের বিপক্ষে জিতে যায়। কেননা ঐ অবস্থায় গ্রুপ পর্ব টপকানোর জন্য শেষ ম্যাচ থেকে পাওয়া পয়েন্টটিও যথেষ্ঠ ছিল না। তবে ব্যাপারটা আরো কঠিন হয়ে পড়েছিল যখন কিউইদের ২৬৬ রান তাড়া করতে গিয়ে মাত্র ৩৬ রানের মাথায় টাইগাররা তাঁদের মহামূল্যবান চারটি উইকেট হারিয়ে ফেলে। পুরো দলের ওপর তখন রীতিমতো আকাশ ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু এবারো দলের হাল ধরেন সাকিব ও মাহমুদউল্লাহ। তাঁদের ২৩২ রানের অনবদ্য জুটিই সেদিন বাংলাদেশিদের স্বপ্ন পূরণে সহায়তা করেছিল। যার মধ্যে ১১ চার ও ১ ছক্কার মারে ১১৫ বলে ১১৪ রান করে সাকিব আউট হয়ে গেলেও, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ১০২ রানে অপরাজিত থেকে যান এবং মোসাদ্দেকের সঙ্গে ‘ফিনিশিং টাচ’ দিয়ে দলকে জয়ের তীরে পৌঁছে দিয়েছিলেন।

২০১০ সালের নিউজিল্যান্ড সিরিজ জেতানো ম্যাচ

উপমহাদেশের অচেনা পরিবেশ বরাবরের মতো সেবারো ওশেনিয়া মহাদেশ থেকে আসা সফরকারীদের চরম পরীক্ষা নিয়েছিল। ঐবছর পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের একটি ম্যাচেও টাইগারদের হারাতে পারেনি কিউইরা। আর বাংলাদেশিদের এই সাফল্যের পিছনে সাকিবের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। প্রথম থেকেই তাঁর দুর্দান্ত অলরাউন্ডিং পারফরম্যান্স দলকে কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করেছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়া পারফরম্যান্সটি তিনি করেছিলেন সিরিজের চতুুর্থ ম্যাচের দিন। বৃষ্টির কারণে দ্বিতীয় ম্যাচটি পরিত্যক্ত হলেও, আগে-পরের দুই ম্যাচেই জয় লাভ করার সুবাদে তখন পর্যন্ত বাংলাদেশই চালকের আসনে ছিল। আবার সেদিনও সাকিবের দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে স্কোরবোর্ডে ২৪১ রান সংগ্রহ করতে সক্ষম হয় টাইগাররা। পরবর্তিতে বল হাতেও দুরন্ত সাকিব মাত্র ৫.৪০ ইকোনমি রেটে ৩ উইকেট শিকার করে কিউইদের ২৩২ রানেই অলআউট করে এক ম্যাচ হাতে রেখেই বাংলাদেশের সিরিজ জয়কে ত্বরান্বিত করেন।

বিশ্বকাপের ময়দানে উইন্ডিজ বধ

গত বিশ্বকাপে খুব একটা আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করতে পারেননি টাইগাররা। তবে সাকিব আল হাসান সবসময়ের মতো এবারো ছিলেন ব্যতিক্রম। গ্রুপ পর্বের ৮ ইনিংসে ৭৫.৭৫ গড়ে ৬০৬ রান সংগ্রহের পাশাপাশি তুলে নিয়েছিলেন ১১টি উইকেট। বিশেষ করে যে তিনটি ম্যাচে বাংলাদেশ জয়ের দেখা পেয়েছিল, তার প্রতিটিতেই সাকিবের বড় ভূমিকা ছিল। এক্ষেত্রে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে খেলা ম্যাচটির কথা না বললেই নয়। প্রথমে ব্যাট করতে নামা ক্যারিবিয়ানরা প্রায় প্রতিটি বোলারের বিপক্ষে আক্রমণাত্নক ব্যাটিং করলেও সাকিবের ওভারগুলোয় তারা খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারেনি। সেদিন নিজের স্পেলের ১০ ওভার বল করে মাত্র ৫২ রানেই ২ উইকেট শিকার করেছিলেন তিনি। পরর ব্যাট হাতেও খেলেছিলেন অপরাজিত ১২৪ রানের অনবদ্য ইনিংস। যা বাংলাদেশকে ৫১ বল হাতে রেখেই ৭ উইকেটের বড় জয় পাইয়ে দিতে সাহায্য করেছিল। তবে এযাত্রায় তরুণ ব্যাটসম্যান লিটনের থেকেও যথেষ্ঠ সমর্থন পেয়েছিলেন সুপারম্যান সাকিব। তাঁর মাত্র ৬৯ বলে বলে খেলা ৯৪* রানের ইনিংসটির সুবাদে তৈরি হয়া অপ্রতিরোধ্য ১৮৯ রানের জুটিই শেষপর্যন্ত ‘গেম চেঞ্জিং মোমেন্টে’ পরিণত হয়েছিল।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক টেস্ট

দীর্ঘ ফর্ম্যাটের ক্রিকেটে কখনোই বড় কোনো আলোর উৎসের মুখ দেখতে পায়নি ইতোমধ্যে স্ট্যাটাস প্রাপ্তির দুই দশক পার করে ফেলা বাংলাদেশ। তবে তামিম-সাকিবদের প্রজন্মের হাত ধরে ইদানিং টেস্ট ক্রিকেটে বেশকিছু বড় সাফল্য লাভ করতে পেরেছে টাইগাররা। এরমধ্যে ২০১৭ সালে ঘরের মাটিতে অস্ট্রেলিয়ানদের বিপক্ষে পাওয়া টেস্ট জয়ের স্মৃতি এখনো পুরোনো হয়নি। সেবার সিরিজের প্রথম টেস্টে তামিম-সাকিবদের দারুণ ইনিংসের সুবাদে ২৬০ রান সংগ্রহ করতে পেরেছিল স্বাগতিকরা। অবশ্য আপাতদৃষ্টিতে স্কোরটিকে ছোট বলে মনে হলেও বাংলাদেশি বোলারদের আগুন ঝরানো বোলিংয়ে সেখান থেকেও কিছু পরিমাণ লিডের দেখা পাওয়া সম্ভব হয়। এদিকে প্রথম ইনিংসে ৮৪ রান করা সাকিব দ্বিতীয় দফায় মাত্র ৫ রান করলেও, তামিমের টানা ফিফটিতে সেই ক্ষত কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ।

এরপর ২৬৫ রানের টার্গেটকে তাড়া করতে নামা অস্ট্রেলিয়া, সাকিবের দুর্দান্ত সাহসী বোলিংয়ে পুনরায় হোঁচট খেতে শুরু করে এবং অবশেষে টাইগাররা ২০ রানের ব্যবধানে তাঁদের হারিয়ে দিয়ে ঐতিহাসিক মুহূর্তের জন্ম দেয়। ঐটেস্টের দুই ইনিংসেই ফিফারের দেখা পাওয়া সাকিবের মোট উইকেট সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ১০টিতে। উল্লেখ্য দুই ইনিংসে তিনি যথাক্রমে ৬৮ ও ৮৫ রান খরচ করেছিলেন।

আরো পড়ুনঃ- বিশ্বের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে অনন্য রেকর্ড গড়লেন সাকিব

মাস্টারক্লাস মুশফিকের সেরা পাঁচ ‘মাস্টারপিস’

সূত্র : ইন্টারনেট / স্পোর্টসজোন ২৪।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *