ক্যাপ্টেন কুল’ এম.এস ধোনির ইতিবৃত্ত

ফিচার

১৯২৯ ভারতীয় সময় ৭টা ২৯ মিনিট। এ সময়টা দেশটির ক্রিকেট ভক্তরা মনে রাখবেন বহুদিন। কারণ আজ সন্ধ্যা ৭টা ২৯ মিনিটে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। বলেছেন, এ সময়ের পর থেকে তাঁকে অবসরপ্রাপ্ত বলে ভাবতে। ভারতের স্বাধীনতা দিবসে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চাপ থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিলেন ধোনি।

যদি বলা হয়, ভারতের জনপ্রিয় খেলা কী? তবে ক্রিকেট ছাড়া খুব কম নামই সামনে আসবে। যদিও ক্রিকেটের শেকড় ইংল্যান্ডে তবুও ভারতে ক্রিকেটের জন্য যত ভক্ত-অনুরাগী আছে তা অন্য সব খেলাধুলার চেয়ে অনেক বেশি।

সাম্প্রতিক কালে ভারতে ক্রিকেট কতটা জশ-খ্যাতি লাভ করেছে তা প্রমাণের জন্য আইপিএল এর নিলাম পর্বই যথেষ্ট। বর্তমানে ভারতের প্রায় প্রতিটি শিশু বা কিশোরের হাজারো স্বপ্নের মাঝে একটি হচ্ছে ভারতের জার্সি গায়ে ভারতের জাতীয় দলে খেলার। হয়তো মাঝে মাঝে তারা এটাও ভুলে যায় যে ‘হকি’ তাদের জাতীয় খেলা। ভারতের জনপ্রিয় ক্রিকেটারদের কথা বললে কিছু নাম আসবে যেমন কপিল দেব, সুনীল গাভাস্কার, গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ প্রমুখ। বলা যায়, তারা ভারতের প্রথম প্রজন্মের জনপ্রিয় ক্রিকেটার।

অনিল কুম্বলে, বীরেন্দর শেবাগ, লিটল মাস্টার শচীন টেন্ডুলকার, সৌরভ গাঙ্গুলি এদের বলা যায় দ্বিতীয় প্রজন্মের জনপ্রিয় ক্রিকেটার। সেই সাথে বর্তমান প্রজন্মের ক্রিকেটারদের মধ্যে কিছু নাম খুবই জনপ্রিয় যেমন মহেন্দ্র সিং ধোনি, বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা। এই সর্বশেষ প্রজন্মের ক্রিকেটারদদের মধ্যে ধোনি বহুল জনপ্রিয় এক নাম। ক্রিকেট মাঠে মস্তিষ্কের তীক্ষ্ণতা ও শীতলতার জন্য তিনি সর্বাধিক জনপ্রিয়।

ভক্তদের কাছে তিনি ‘ক্যাপ্টেন কুল’,’মাহি’, ‘MSD‘ নামেও পরিচিত। তিনি ধীরে ধীরে খ্যাতি অর্জন করেন এবং তার সাফল্যের গল্প সত্যিকার অর্থেই অনুপ্রেরণামূলক।

জন্ম ও শৈশব:

মহেন্দ্র সিং ধোনি ৭ জুলাই, ১৯৮১ বিহারের রাঁচিতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা পান সিং এবং মায়ের নাম দেবকি দেবী। পান সিং রাঁচির মেকন লিমিটেডে জুনিয়র ম্যানেজার পদে চাকরি করতেন এবং দেবকি দেবী ছিলেন গৃহিণী। ধোনি ডিএভি জহর বিদ্যা মন্দির, শ্যামলী (বর্তমান জেভিএম, শ্যামলী, রাঁচি)-তে পড়াশোনা করেছেন।

সেখানে অধ্যয়নের সময় তিনি ব্যাডমিন্টন এবং ফুটবলে খেলায় অংশগ্রহণ করতেন এবং জেলা ও ক্লাবপর্যায়ের খেলাগুলোয় মনোনীত হন।

আকস্মিক যাত্রা

যখন ধোনী তার স্কুলে ফুটবল দলে ছিলেন খেলতেন তখন তিনি গোলকিপার হিসেবে দলে অবদান রাখেন। একবার তার ফুটবল কোচ তাকে ক্রিকেট দলের উইকেটকিপার হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। তিনি সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন তার উইকেট কিপিংয়ের গোপন প্রতিভার মাধ্যমে।

ছোট বেলার ধোনি:

উইকেট রক্ষায় তার অসামান্য দক্ষতার কারণে কমান্ডো ক্রিকেট ক্লাবে (১৯৯৫-৯৮) পর্যন্ত নিয়মিতভাবে উইকেট-রক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। দক্ষতার ফলস্বরূপ ১৯৯৭-৯৮ মৌসুমে অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপে ভিনু মানকড় ট্রফির জন্য মনোনীত হন।

প্রাথমিক কর্মজীবন

২০০১-২০০৩ সময়কালে, তিনি খড়গপুর রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেনের টিকেট পরীক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন, যা পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার দক্ষিণ পূর্ব রেলপথে অবস্থিত। দ্বাদশ শ্রেণী অবধি তিনি শুধুমাত্র স্কুল ও ক্লাবের হয়ে খেলতেন। তখন পর্যন্ত তিনি পেশাদার ক্রিকেটে পা রাখেননি। ১৯৯৮ সালে দেবল সহায় তাকে সেন্ট্রাল কোল ফিল্ডস লিমিটেড (সিসিএল) দলের হয়ে খেলার জন্য নির্বাচন করেন।

ধোনি যখন সিসিএলের হয়ে শীষমহল টুর্নামেন্ট ক্রিকেট খেলছিলেন, দেবল সহায় তখন সেই টুর্নামেন্টে তার প্রতিটি ছয় মারার জন্য ৫০ রুপি উপহার দিতেন। ধোনীর বিহার ক্রিকেট দলে সুযোগ পাওয়ার পিছনে দেবল সহায়ের অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৯৮-৯৯ সালে ধোনি বিহার অনুর্ধ্ব-১৯ দলে জায়গা পান এবং পরে ইস্ট জোনের অনুর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে সি.কে নাইডু ট্রফিতে খেলেন।

রঞ্জি ট্রফি এবং ঝাড়খন্ড ক্রিকেট দল

১৯৯৯-২০০০ সালে ধোনী বিহারের হয়ে রঞ্জি ট্রফিতে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। তিনি ১৯৯৯/২০০০, ২০০০/২০০১,২০০১/২০০২ সময়কালে তিন বছর ধরে বিহার দলের জন্য খেলেছেন। সে সময়ে রঞ্জি ট্রফিতে তিনি তিনটি অর্ধ-শতক হাঁকিয়েছিলেন।

২০০৩ সালে তিনি ঝাড়খন্ডের হয়ে জামশেদপুরে যখন খেলছিলেন তখন তার অসাধারণ প্রতিভা টিআরডিও (TRDO) অফিসার প্রকাশ পোদ্দারের নজর কাড়েন। প্রকাশ পোদ্দার ধোনির খেলায় মুগ্ধ হন এবং ন্যাশনাল ক্রিকেট একাডেমিতে একটি রিপোর্ট পাঠান।

ভারত-এ দলে প্রবেশ

ক্রমাগত প্রচেষ্টা ও ধারাবাহিকতার কারণে ২০০৩-০৪ সালে তিনি ভারত-এ দলের হয়ে জিম্বাবুয়ে ও কেনিয়া সফরের জন্য দলে ডাক পান। পর পর শতক হাঁকিয়ে তিনি তখনকার ভারতীয় দলের অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলির চোখে পড়েন।এদিকে দিনেশ কার্তিককে উইকেটকিপার হিসেবে দলে নেওয়ার জন্য সন্দীপ পাতিল ও সুপারিশ করেছিলেন।

ওডিআই (ODI) ক্যারিয়ার

ভারত-এ দলে ভালো খেলার সুবাদে তিনি ২০০৪-০৫ সালে ভারত জাতীয় দলের হয়ে বাংলাদেশ সফরের জন্য সুযোগ পান। ধোনি পরে পাকিস্তান সিরিজের জন্যও দলে জায়গা পান। তবে জাতীয় দলের হয়ে প্রথম দিকের ম্যাচগুলোতে ব্যাট হাতে তেমন জ্বলে উঠতে পারেননি।

তারপর তার ঘুরে দাঁড়ানোর সময় আসে অক্টোবর-নভেম্বর, ২০০৫ সালে। শ্রীলঙ্কার সাথে দ্বিপাক্ষিক সিরিজের ৩য় ওডিআই ম্যাচে ধোনী আবার নিজের স্বরূপে ফিরে আসে। সেই ম্যাচে শ্রীলঙ্কার দেওয়া ২৯৯ রানের জবাবে ধোনী ১৪৫ বলে অপরাজিত ১৮৩ রানের ম্যাচজয়ী ইনিংস খেলেন। ক্রমাগত সাফল্যের কারণে তিনি ২০ এপ্রিল, ২০০৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার রিকি পন্টিং কে সরিয়ে আইসিসি ওডিআই র‌্যাঙ্কিং এ শীর্ষস্থান দখল করেন।

২০০৭ বিশ্বকাপ

২০০৭ ওয়ার্ল্ড কাপ ছিলো ধোনীর জন্য খারাপ সময়। গ্রুপ পর্বে ভারত দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে আসর থেকে বিদায় নেয়।

এই দুই ম্যাচেই ধোনী শূণ্য রানে আউট হন এবং এই আসরে সর্বমোট ২৯ রান করেন। এর ফলে তার ভক্তরা তার উপরে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং রাঁচিতে তার নির্মাণাধীন বাড়িতে হামলা চালায়।

অধিনায়ক হিসেবে উত্থান

২০০৫ সালে ধোনী ‘বি-গ্রেড’ চুক্তিতে চুক্তিবদ্ধ হন।পরবর্তীতে ভালো খেলার ফলস্বরূপ ২০০৭ সালের জুনে ‘এ-গ্রেড’ এ চুক্তিবদ্ধ হন। সেই সাথে শচীনের সুপারিশে সেপ্টেম্বর, ২০০৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত আইসিসি টি-২০ বিশ্বকাপে ভারতীয় দলের নেতৃত্ব দেন ধোনী।

যথাযোগ্য নেতৃত্ব দিয়ে ফাইনালে পাকিস্তানকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয় ধোনীর ভারত।

২০১১ ও ২০১৫ বিশ্বকাপ

বলা যায়, ২০১১ বিশ্বকাপ ধোনীর সবচেয়ে বড় অর্জন। ধোনীর নেতৃত্বে ভারত ফাইনালে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে ২৮ বছরের অপেক্ষার প্রহর সমাপ্ত করে।

ফাইনালে ধোনী ৯১ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন এবং ম্যান অব দ্য ম্যাচ হন। ২০১৫ বিশ্বকাপে ভারত গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোতে ভালো করলেও সেমি ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে বিদায় নেয়।

টেস্ট ক্যারিয়ার

২০০৫ সালে তার টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক হয়। ধোনি ৯০টি টেস্ট খেলে ৪,৮৭৬ রান করেন। তিনি ৬টি শতক ও ৩৩টি অর্ধ-শতক করেন এবং তার ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রান ২২৪। ২০১৪-১৫ সালে তিনি টেস্ট ক্রিকেটকে বিদায় জানান।

আইপিএল

আইপিএল এর ১ম আসরে চেন্নাই সুপার কিংস ১.৫ মিলিয়ন ডলার দিয়ে তাকে কেনে। যেটা ছিলো নিলামের সর্বোচ্চ দাম।

তার নেতৃত্বে চেন্নাই ৩ বার আইপিএল ও ২ বার চ্যাম্পিয়নস লিগ-২০ তে শিরোপা লাভ করে।

অর্জনসমূহ

ভারতের অধিনায়ক হিসেবে তিনি সবচেয়ে বেশি টেস্টে জয়লাভ করেন। তার অধিনায়কত্বে ভারত ৬০টি টেস্টের ২৭টিতে জয়লাভ করে। সেইসাথে ২০০৯ সালে ভারত টেস্টে শীর্ষস্থান দখল করে।

‘পদ্মভূষণ’

এছাড়া তার নেতৃত্বে ভারত ২০০৭ সালে টি-২০ বিশ্বকাপ, ২০১১ সালে বিশ্বকাপ, ২০১৩ সালে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি অর্জন করে সেইসাথে তিনি ভারতের সামরিক সম্মান ‘পদ্মশ্রী’, ‘পদ্মভূষণ’ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল উপাধিতে ভূষিত হন। ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে ধোনি সর্বোচ্চ সফল অধিনায়ক হিসেবে গণ্য হন।

ব্যক্তিগত জীবন

২০১০ সালের ৪ জুন তিনি সাক্ষী সিং রাওয়াতের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তারা একই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন। ২০১৫ সালে তাদের সংসারে নতুন অতিথির আগমন ঘটে যার নাম ‘জিভা’। ধোনি এখন এক কন্যা সন্তানের জনক।

ধোনি বর্তমানে ২০টি পণ্যের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে আছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে PEPSICO,TVS, LAVA, DREAM11, REEBOK,AIRCEL ইত্যাদি।

আরো পড়ুনঃ- এক নজরে এমএস ধোনির যত অর্জন

তথ্য: ইন্টারনেট ও খেলা ডট কম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *