খেলার রাজনীতিকরণ এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিপক্ষে মোহনবাগানের দাঁতভাঙা জবাব

ফিচার

“খেলার সাথে রাজনীতি মেশাবেন না” ভারত-পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশ-পাকিস্তান ক্রিকেট রথে বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দ। খেলার সাথে শুধু রাজনীতিই নয় বরং খেলার সাথে মিশে আছে ধর্ম, সংস্কৃতি, রাজনীতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য। উপমহাদেশকে ব্রিটিশ রাজত্ব থেকে বেরিয়ে আনার পিছনে খেলাধুলা অস্তিত্বকে কোনভাবেই হালকা করে নেয়ার সুযোগ নেই। এরকমই এক পরিস্থিতিতে ব্রিটিশদের বিপক্ষে ফুটবলের মাধ্যমে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল তাঁর সাথে জড়িয়ে আছে যে ক্লাবটির নাম সেটি মোহনবাগান।

আমাদের সূর্য মেরুন
নাড়ির যোগ সবুজ ঘাসে
আমাদের খুঁজলেই পাবে
সোনায় লেখা ইতিহাসে….

সুমন্ত চৌধুরীর লেখা এই গানটি ব্যবহৃত হয়েছে অরুণ রয় নির্মিত “এগারো” মুভিতে। এই মুভিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মোহনবাগান এর ইতিহাস এবং ঐতিহ্যকে। রিয়াল মাদ্রিদ কিংবা বার্সেলোনার চেয়েও প্রাচীন এই ক্লাবটি শুধুই একটি ফুটবল দলই নয় বরং ব্রিটিশদের আধিপত্যের বিপক্ষে প্রথম জয়ের সেনাপতি।

ব্রিটিশরা এদেশে ফুটবল এনেছিল অনেকটা দেশীয়দের তাচ্ছিল্য করার জন্যই। কিন্তু গোরাদের অস্ত্রে গোরাদেরকেই কাবু করে দিয়েছিল বাঙালিরা। উত্তর কলকাতার তিন অভিজাত বাঙালি মিত্র, সেন ও বসু পরিবার মিলে গড়ে তোলে এই ক্লাব। ১৮৮৯ সালের ১৫ অগস্ট মিত্র পরিবারের কিরটী মিত্রের মোহনবাগান ভিলায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় এই ক্লাবের নাম রাখা হয় “মোহনবাগান স্পোর্টস ক্লাব”। কথিত আছে, মোহনবাগান ভিলায় ইডেন হিন্দু হোস্টেলের বিরুদ্ধে এই দল প্রথম খেলেছিল। প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ঠিক আগে অধ্যাপক এফ. জে. রো জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, এই দল কোনো রাইফেল শ্যুটিং বা আংলিং বা এই জাতীয় খেলার সঙ্গে যুক্ত কিনা। মোহনবাগান এই জাতীয় খেলার সঙ্গে যুক্ত নয় জেনে তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন দলের নাম পালটে ‘মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাব’ রাখতে। ক্লাবের কর্মকর্তারা এই পরামর্শ মেনে নিয়ে ক্লাবের নাম পরিবর্তন করেন।

১৮৯৩ সাল। প্রথমবারের মতো মোহনবাগান অংশ নেয় কোচবিহার কাপ টুর্নামেন্টে। সেই টুর্নামেন্টেই ১৯০৪ সালে প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন হয়ে শুরু করে জয়রথ। ১৯০৫ সালে আবারও সেই টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন মোহনবাগান। এই বছরই চুঁচুড়ায় আয়োজিত গ্ল্যাডস্টোন কাপে তৎকালীন আইএফএ শিল্ড জয়ী ডালহৌসিকে মোহনবাগান ৬-১ গোলে পরাজিত করে। ১৯০৬ সালে মোহনবাগান ট্রেডস কাপ, গ্ল্যাডস্টোন কাপ ও কোচবিহার কাপ এক সঙ্গে জয় করে। ১৯০৭ সালে মোহনবাগান আবার ট্রেডস কাপ জেতে। ১৯০৮ সালেও এই কাপ জিতে পরপর তিন বছর এই কাপ জয়ের রেকর্ড সৃষ্টি করে।

১৯১১ সালে ব্রিটিশদের বিপক্ষে ফাইনালে মোহনবাগান

১৯১১ সাল ভারতের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় সাল। বঙ্গভঙ্গ এবং ক্ষুদিরামের ফাঁসিতে উত্তেজনা বিরাজ করছে সমগ্র অবিভক্ত বাংলায়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের একের পর এক কর্মকাণ্ডের বিপক্ষে বাঙালির প্রতিবাদের একমাত্র ভাষা ছিল ফুটবল। এই বছরই প্রথম আইএফএ শিল্ড জয় করে মোহনবাগান। ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টের ফুটবলারদের যথোপযুক্ত পোশাক পরিহিত সুসজ্জিত দলের বিপক্ষে খালি পায়ে খেলে ২-১ এ হারিয়ে শিরোপা জয়ের স্বাদ পায় কলকাতার নেটিভ মোহনবাগান। প্রথমার্ধে ১-০ তে পিছিয়ে পড়া মোহনবাগান ফিরে এসেই অধিনায়ক শিবদাস ভাদুড়ির গোলে সমতায় ফেরে। ইডেনের ৮০ হাজার দর্শকের গলায় তখন “জয়তু মোহনবাগান” এর পরিবর্তে “বান্দে মাতরাম”। খেলা শেষের ঠিক আগ মুহুর্তে অভিলাষ ঘোষের গোলে সেই বিখ্যাত জয় তুলে নেয় মোহনবাগান। এর আগে সেমিফাইনালেও আরেক ব্রিটিশ দল মিডলসেক্সকে হারায় মোহনবাগান।

মোহনবাগানের বিপক্ষে খেলেছেন সর্বকালের সর্বসেরা ফুটবলার পেলে এবং সর্বসেরা গোলকিপার অলিভার কানও।
১৯৭৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মোহনবাগান বিখ্যাত নর্থ আমেরিকান সকার লিগ দল নিউ ইয়র্ক কসমসের বিরুদ্ধে একটি মৈত্রী ফুটবল ম্যাচ খেলে। এই ম্যাচে পেলে নিউ ইয়র্ক কসমসের হয়ে খেলেছিলেন।

মোহনবাগানের বিপক্ষে ইডেন গার্ডেনে মাঠে নেমেছেন পেলে

২০০৮ সালে মোহনবাগান জার্মান আন্তর্জাতিকের বিরুদ্ধে খেলার সুযোগ পায়। এফসি বায়ার্ন মিউনিখের অফিসিয়াল টেস্টিমোনিয়ালে ছিলেন অলিভার কান। কান ছাড়াও জে রোবার্তো ও মার্ক ফন বোমেল বায়ার্ন দলে উপস্থিত ছিলেন। ২০০৮ সালের ২৭ মে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ম্যাচটি আয়োজিত হয়েছিল।

২০০৭ সালে মোহনবাগান বনাম বায়ার্ন মিউনিখের ম্যাচে বায়ার্নের অধিনায়ক ওলিভার কান

পদাঘাতের বিপরীতে পদাঘাত শুধু মাত্র ফুটবলেই সম্ভব। স্বামী বিবেকানন্দের এই কথা বাস্তবতা পেয়েছিল মোহন বাগানের ক্ষেত্রে। সুসজ্জিত ব্রিটিশ দল গুলোর বিপক্ষে খালি পায়ে জয় পেয়ে ব্রিটিশদের প্রথম পরাজয়ের স্বাদ এনে দিয়েছিল উপমহাদেশের প্রাচীন ফুটবল ক্লাব মোহন বাগান। ১৮৮৯ সালের ১৫ই আগস্ট প্রতিষ্ঠিত এই ক্লাবের হাত ধরে যে ইতিহাস রচিত হয়েছিল তা পূর্ণতা পেয়েছিল ঠিক ৫৮ বছর পরে ১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্ট। এদেশ থেকে চলে যেতে বাধ্য হয় ব্রিটিশরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *