ক্রিকেট আগে এসেছে না ফুটবল?

ফিচার

গত মঙ্গলবারের পর থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গুগল সার্চে করোনাকেও পিছনে ফেলে দিয়েছিল মেসি-বাসার দ্বন্দ্বের খবরটি। মেসি কেন দল ছাড়ছেন? তাঁর পরবর্তি গন্তব্যই বা কি – এধরনের প্রশ্নের উত্তর সামাল দিতে গিয়ে গুগলও যেন এখন হয়রান হয়ে গেছে। আর ছোট্ট এই ঘটনাটিই প্রমাণ করে যে, বিশ্বে ফুটবলের জনপ্রিয়তা কতটুকু। অন্যদিকে ক্রিকেটকে দেখুন। জন্মের শতশত বর্ষ পেরিয়ে আজও খেলাটি মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এমনকি জন্মভূমি ইংল্যান্ডের অনেক মানুষও এখন পর্যন্ত ক্রিকেটের অ আ ক খ সম্পর্কে ধারণা অর্জন করতে পারেনি। তাই কখনো যদি প্রশ্ন করা হয়, ‘আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রিকেট আগে এসেছে না ফুটবল?’ তাহলে বেশিরভাগ মানুষই চোখ বন্ধ করে বলে উঠবেন, ‘ফুটবল’। কিন্তু ইতিহাস কি বলছে, সেটি নাহয় একবার শুনে আসি।

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, প্রথম কোনো স্বীকৃত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ আয়োজিত হয়েছিল আমেরিকায়, ১৮৪৪ সালে। সেবছরের ২৪ ও ২৫ সেপ্টেম্বর কানাডার বিপক্ষে দুইদিনের একটি ম্যাচ খেলতে নিউইয়র্কের সেন্ট জর্জ ক্রিকেট ক্লাবের মাঠে নেমেছিলেন স্বাগতিকরা। যেখানে টসে জিতার পর প্রথমে ফিল্ডিং করাটাই সুবিধাজনক বলে মনে হয়েছিল মার্কিনিদের। অন্যদিকে প্রথমে ব্যাট করতে নামা কানাডিয়ানরা তাদের প্রথম ইনিংসে দুর্ভাগ্যজনকভাবে মাত্র ৮২ রানেই অলআউট হয়ে যায়। তবে পরবর্তিতে বোলারদের দারুণ পারফরম্যান্সের সুবাদে প্রতিপক্ষকেও ৬৪ রানের মাঝেই ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হন তারা। আবার দ্বিতীয় ইনিংসেও একইভাবে অত্যন্ত কম রানেই (৬৩ রান) অলআউট হয়ে যায় সফরকারীরা। পরে অবশ্য মার্কিনিরা ৮২ রানের টার্গেটকে তাড়া করতে গিয়ে আবারো ৫৮ রানেই অলআউট হয়ে যায় এবং ফলশ্রুতিতে কানাডা ম্যাচটিতে ২৩ রানের ব্যবধানে জয় লাভ করে। এদিকে ম্যাটি মূলত দুইদিনের মধ্যেই আয়োজিত হওয়ার কথা থাকলেও খেলা শুরুর তৃতীয় দিন, অর্থাৎ ২৬শে সেপ্টেম্বরেও ম্যাচটি মাঠে গড়িয়েছিল। কারণ আবহাওয়াজনিত কারণে তার আগেরদিনের খেলা পরিত্যক্ত হয়েছিল এবং আয়োজকরা সেজন্য তৃতীয় দিন পর্যন্ত ম্যাচটির সময়সীমা বৃদ্ধি করেছিলেন। আরেকটি মজার ব্যাপার হলো, এই ম্যাচটিকে নিজের চোখে দেখতে সেবার প্রায় ২০ হাজারের মতো মানুষ মাঠে এসেছিলেন বলে জানা যায়।

এর প্রায় ৩৩ বছর পর, অর্থাৎ ১৮৭৭ সালে দুই ম্যাচের একটি সিরিজ খেলতে অস্ট্রেলিয়া সফরে যান ইংলিশরা। যেগুলোকে পরবর্তিতে ইতিহাসের প্রথম দুইটি টেস্ট ম্যাচের মর্যাদা দেওয়া হয়। কয়েকবছর পর, ১৮৮৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকাও টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়ে যায়। তারপর একে একে আরো ৯টি দল এই ক্লাবে প্রবেশ করেছে। তবে শুরু থেকেই টেস্ট ফর্ম্যাটটি অতিরিক্ত সময় অপচয়ের জন্য কুখ্যাত ছিল। যেকারণে একটা সময় অনেক দেশের সরকার নিজ দেশে ক্রিকেটের প্রচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে শুরু করেন। ফলে ক্রিকেট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোও খেলাটিকে আরো যুগোপযোগী ও আধুনিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে নতুন ফর্ম্যাট আবিষ্কারের ব্যাপারে মনোনিবেশ করতে থাকেন। অবশেষে অনেক গবেষণার পর ১৯৭১ সালের ৫ই জানুয়ারি ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার এক দ্বিপাক্ষিক সিরিজের মাধ্যমে ওয়ানডে ক্রিকেট আত্মপ্রকাশ করে। এবারো ভেন্যু হিসেবে ছিল সেই ঐতিহাসিক মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডই, যেখানে প্রায় একশো বছর আগে ইতিহাসের প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলা হয়েছিল। আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সবচেয়ে ছোট ফর্ম্যাট টি-টোয়েন্টি তো বয়সের হিসাবেও রীতিমতো পিচ্চি বাচ্চা। এবছর সবেমাত্র ষোলোতে পা রেখেছে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট ।

এরপরও যদি কেউ ভেবে থাকেন যে, ক্রিকেটের আগেই ফুটবলে আন্তর্জাতিকতার ছোঁয়া লেগেছে, তাহলে সেটি ভুল ধারণা। কেননা প্রথমবারের মতো কোনো আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচের দেখা মিলেছিল ১৮৭২ সালের ৩০শে নভেম্বরে। গ্রেট ব্রিটেনের দুই রাষ্ট্র – ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের মধ্যকার আয়োজিত সেই ম্যাচটি অবশ্য গোলশূন্য ড্র হয়েছিল। তবে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের মতানুসারে, প্রথম আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ ১৮৭০ সালে ইংল্যান্ড-স্কটল্যান্ডের মাঝে আয়োজিত হয়েছিল। সেই সফরের পাঁচ ম্যাচের মধ্যে তিনটিতেই স্বাগতিকদের পরাজিত করে ইংলিশরা। সুতরাং এই হিসাবেও ক্রিকেটের আরো অনেক পরে আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ আয়োজিত হয়েছিল। এমনকি শুধু ফুটবলই নয় বরং রাগবি, বাস্কেটবল কিংবা টেনিসের মতো জনপ্রিয় খেলাগুলোকেও এপর্যায়ে যেতে উনিশ শতকের সত্তরের দশক পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। তুলনামূলকভাবে আগে শুরু হওয়া গলফেরও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পদচারণার শুরুটা হয়েছিল ১৯৬০ সালে।

এখন প্রশ্ন হলো, এতো আগে আশার আলো দেখিয়েও কেন এখনো অন্যান্য বিশ্বমানের খেলাধুলার তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে ক্রিকেট? এর পিছনে অবশ্য বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত শুরুর দিকে ক্রিকেট খু্বই সময়সাপেক্ষ একটি খেলা ছিল এবং তখন শুধুমাত্র টেস্ট ফর্ম্যাটেই খেলা হতো। যেকারণে তখনকার অনেক রাজনৈতিক নেতারাই দেশে ক্রিকেটের প্রসার বিস্তারকে একেবারে রোধ করে দিয়েছিলেন। এরফলে রাশিয়া-আয়ারল্যান্ডসহ ক্রিকেটের অনেক সম্ভাবনাময় দেশগুলোকে বাধ্য হয়েই খেলাটির চর্চা বন্ধ করে দিতে হয়। পরের কারণটি হলো দূরদর্শিতার অভাব। ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা যেখানে ১৯৩০ সাল থেকেই বিশ্বকাপ আয়োজন করে আসছে, সেখানে আইসিসিকে বিশ্বকাপের জন্য সুবিধাজনক ফর্ম্যাট আবিষ্কার করতেই আরো একুশটি বছর ব্যয় করতে হয়েছে। তাছাড়া ফিফা যেভাবে ফুটবলকে সারাবিশ্বে পৌঁছে দিতে পেরেছে, আইসিসি সেটা পারেনি। এই যেমন, ফিফা এখন যেক্ষেত্রে তাদের ৩২ দলের বিশ্বকাপকে ৪৮ দলে উন্নীত করতে চাইছে, আইসিসি সেক্ষেত্রে ‘ব্যবসায়ীক’ স্বার্থে ক্রিকেট বিশ্বকাপকে মাত্র দশটি দলের মাঝেই সীমাবদ্ধ করে ফেলছে।

তবে এটাও ঠিক যে, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের মাধ্যমে আইসিসি এখন ক্রিকেটকে ফুটবলের মতো করে পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। গত বছরের ১লা জানুয়ারি থেকে তারা নিজেদের সদস্যপদ প্রাপ্ত ১০৫টি দেশকেই টি-টোয়েন্টি স্ট্যাটাস দিয়ে দিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ইউরোপের অনেক দেশেই এখন উন্নত দলগুলোর অনুসরণে টি-টোয়েন্টি লিগ আয়োজনের রেওয়াজ শুরু হয়েছে। এমনকি ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা কিংবা জার্মানি-ফ্রান্সের মতো দেশেও এখন নিয়মিতভাবে ক্রিকেট চর্চা চলছে। আর আইসিসি যদি এভাবেই এগিয়ে যেতে পারে, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো খেলাটি তার হারানো যৌবনকে ফিরে পেতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *