বিশ্বসেরা ছয় টি-টোয়েন্টি লিগ এবং তাদের সেঞ্চুরিয়ানদের গল্প

ফিচার

একটা সময় অনেকের কাছে ক্রিকেট ছিল রীতিমতো ভয়ের বস্তু। টানা কয়েকদিন ধরে খেলা চলার ফলে একদিকে কিছু মানুষের মধ্যে যেমন একঘেয়েমি ভাব এসে পড়ত, তেমনি সময় অপচয়কারী খেলা হিসেবে গণ্য করে আরো অনেকে বিশ্বব্যাপী ক্রিকেটের প্রসার পর্যন্ত ঘটতে দেননি। অনেক পরে, ১৯৭১ সালে ওয়ানডে ক্রিকেটের প্রচলন শুরু হলে ধীরে ধীরে অনেক দেশ ক্রিকেটের প্রতি ঝুঁকে পড়তে থাকে যা পূর্ণতা পায় ২০০৪ সালে, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের আগমনের মধ্যদিয়ে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই নিয়মিত ক্রিকেট চর্চা চলছে এবং ইতোমধ্যে শতাধিক দেশ টি-টোয়েন্টি স্ট্যাটাস পেয়ে গেছে। পাশাপাশি টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের সু্বিধাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিনিয়তই সারাবিশ্বে অসংখ্য ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজিত হয়ে আসছে। যার মধ্যে সবচেয়ে নজরকাড়া আয়োজনগুলো হয় ক্রিকেটীয় পরাশক্তির দেশগুলোতে আয়োজিত ঘরোয়া ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোর সময়। স্থানীয় ও বিদেশি তারকা ক্রিকেটারদের মধ্যে চলা ব্যাটে-বলের এই দারুণ লড়াইটিকে উপভোগ করেন না, এমন মানুষ খুব কমই পাওয়া যায়। যেহেতু অনেক বোদ্ধার মতে, এখনকার সময়টা ব্যাটসম্যানদের, তাই ক্রিকেট বিশ্বের সেরা ছয়টি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের মোট সেঞ্চুরির তুলনা নিয়েই থাকছে আজকের আয়োজন।

টি-টোয়েন্টি ব্লাস্ট (ইংল্যান্ড)

এ্যাডাম লিথ। ছবি : সংগৃহীত।

বিশ্বজুড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের পরিচিতি মূলত আইপিএলের হাত ধরে এলেও, আন্তর্জাতিকভাবে টি-টোয়েন্টি ফর্ম্যাটের জন্মের আগে থেকেই ইংল্যান্ডে ছোট ফর্ম্যাটের ক্রিকেট লিগ চলে এসেছে। এমনকি অন্যান্য বিখ্যাত টুর্নামেন্টগুলোর তুলনায় ইংল্যান্ডের ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি লিগটির প্রতিটি মৌসুমে বেশি ম্যাচ আয়োজিত হয়ে থাকে। যেকারণে স্বাভাবিকভাবেই টুর্নামেন্টটির ইতিহাসে যেসব ব্যাটিং কিংবা বোলিং রেকর্ডস তৈরি হয়েছে, অন্যান্য লিগগুলো তার ধারেকাছেও নেই। শুধুমাত্র ২০১৪ সাল থেকে আজ পর্যন্ত টুর্নামেন্টটি ৭২টি সেঞ্চুরির দেখা পেয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক তিন অঙ্কের এই ম্যাজিক্যাল ফিগারের দেখা পেয়েছে মাইকেল ক্লিঞ্জারের ব্যাট। ২০১৪ সালে টি-টোয়েন্টি ব্লাস্ট একটি বৈশ্বিক লিগ হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পর থেকে মোট ৬ বার সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিলেন তিনি। অন্যদিকে টুর্নামেন্টটির সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোরের রেকর্ডটি রয়েছে অ্যাডাম লিথের দখলে। ইয়র্কশায়ারের হয়ে ২০১৭ সালে নর্থহ্যাম্পটনশায়ারের বিপক্ষে ১৬১ রানের দুর্দান্ত সেই ইনিংসটি খেলেছিলেন তিনি।

ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (ভারত)

ক্রিস গেইল। ছবি : সংগৃহীত।

টি-টোয়েন্টি ব্লাস্টের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫৯টি সেঞ্চুরি প্রত্যক্ষ করেছে বিশ্বের সবচেয়ে দামি ঘরোয়া ক্রিকেট লিগ – আইপিএল। যার মধ্যে ১৩টি সেঞ্চুরিই এসেছে হতভাগা রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোরের ব্যাটসম্যানদের পক্ষ থেকে, যারা এখনো পর্যন্ত কোনো আইপিএল শিরোপার স্বাদ পাননি। অন্যদিকে সেঞ্চুরি হাঁকানোর এই দৌড়ে ব্যাটসম্যানদের মাঝে সবচেয়ে এগিয়ে ছিলেন জ্যামাইকার সন্তান ক্রিস গেইল। গতবছর পর্যন্ত মোট ছয়বার আইপিএলে একশো রানের কোটা ছুঁয়েছিলেন তিনি। এছাড়া আইপিএলের সেরা ব্যক্তিগত ইনিংসের (১৭৫* রান) রেকর্ডটির পাশেও রয়েছে তারই নাম। যেটি আইপিএলের পঞ্চম আসরে পুনে ওয়ারিয়র্সের বিরুদ্ধে খেলেছিলেন।

বিগ ব্যাশ লিগ (অস্ট্রেলিয়া)

উসমান খাজা। ছবি : সংগৃহীত।

ক্রিকেট ইতিহাসের প্রাচীনতম ও শক্তিশালী দলগুলোর মাঝে আরেকটি হলো অস্ট্রেলিয়া। জাঁকজমকপূর্ণ ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজনে তারাও কারো তুলনায় পিছিয়ে নেই। সেই ২০১১ সাল থেকে বিশ্বখ্যাত তারকাদের সমন্বয়ে নিজস্ব ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি লিগ আয়োজন করে আসছে তারা। আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে, প্রতিনিয়তই ক্রিকেটে নতুন নতুন দুর্দান্ত নিয়ম বা প্রযুক্তি সংযোজনেও মরিয়া হয়ে রয়েছেন তারা। আধুনিক ক্রিকেটে যে এলইডি লাইটযুক্ত জিং বেলস এবং স্ট্যাম্পগুলো দেখছেন, তার সবই এসেছে বিগ ব্যাশের হাত ধরে। এমনকি গত আসরে তারা পাড়ার ক্রিকেটের ন্যায় ব্যাট দিয়ে টস করার অভিনব এক পদ্ধতিও চালু করেছিলেন।

তবে এতকিছুর পরও মোট সেঞ্চুরির দিক থেকে প্রথম দুই লিগের চেয়ে অনেকাংশেই পিছিয়ে রয়েছে বিবিএল। নয় মৌসুমে মাত্র ২৪টি সেঞ্চুরির গল্প এখানে লিপিবদ্ধ হয়েছে। অবশ্য অন্যদের তুলনায় বিগ ব্যাশের পিছিয়ে থাকার কিছু কারণও রয়েছে। প্রথমত, অস্ট্রেলিয়ার বেশিরভাগ মাঠের আকার-আয়তন বিশ্বের যেকোনো মাঠের তুলনায় বড়। এর ওপর এখানকার বাউন্সি উইকেট ব্যাটসম্যানদের জন্য প্রায়শই বিপদজনক হয়ে ওঠে। তারপরও টুর্নামেন্টটিতে ডি’আর্চি শট, শের্ন ওয়াটসন, লুক রাইট, ক্রেগ সিমন্স এবং উসমান খাজার প্রত্যেকের দুইটি করে সেঞ্চুরি রয়েছে, যা বিবিএলের ইতিহাসে কোনো ব্যাটসম্যানের জন্য সর্বোচ্চ। অবশ্য টুর্নামেন্টটির সেরা ইনিংসের রেকর্ডটি এখনো দখলে রেখেছেন মার্কাস স্টোনিস। মেলবোর্ন স্টারসের এই তারকা নিজের অপরাজিত ১৪৭ রানের ইনিংসটি খেলেছিলেন সিডনি সিক্সার্সের বিরুদ্ধে।

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বাংলাদেশ)

তামিম ইকবাল। ছবি : সংগৃহীত।

বিদেশি লিগগুলোর ব্যাপক জনপ্রিয়তা লক্ষ্য করে ২০১২ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ নামে একটি ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি লিগ আয়োজনের উদ্যোগ নেয় বিসিবি। ২০২০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত টুর্নামেন্টটি গৌরবের সঙ্গে তার সাতটি মৌসুম পার করে ফেলেছে। যেখানে খেলে গিয়েছেন ক্রিস গেইল, এবিডি ভিলিয়ার্সের মতো বিধ্বংসী ব্যাটসম্যান কিংবা মুত্তিয়া মুরালিধরন, লাসিথ মালিঙ্কার মতো দুর্দান্ত সাহসী বোলাররা। ফলে এপর্যন্ত আয়োজিত টুর্নামেন্ট সংখ্যা বিবেচনায় সেঞ্চুরি হাঁকানোর দিক থেকে উপরের তিনজনের তুলনায় পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও। গত আটবছরে আয়োজিত সাত আসরে দেশি-বিদেশি ব্যাটসম্যানরা বাংলাদেশি দর্শকদের একুশটি সেঞ্চুরি উপহার দিয়েছেন। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫টি সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন ক্যারিবিয়ান দানব ক্রিস গেইল। আবার সর্বোচ্চ ৬টি সেঞ্চুরির দেখা পাওয়া দলটির নাম হচ্ছে রংপুর রেঞ্জার্স। তবে আইপিএলের মতো এখানেও সেরা ব্যক্তিগত ইনিংসের রেকর্ডের মালিক হচ্ছেন সেই ক্রিস গেইলই। ২০১৭ সালে ঢাকা ডাইনামাইটসের বিরুদ্ধে অপরাজিত ১৪৬ রানের অনন্য সাধারণ এই ইনিংসটি খেলেছিলেন রংপুর রাইডার্সের এই সুপার স্টার। অন্যদিকে ঠিক তার পরের আসরের ফাইনালে অপরাজিত ১৪১ রানের এরকমই একটি দারুণ ইনিস খেলেন টাইগারদের বর্তমান ওয়ানডে অধিনায়ক ও ড্যাশিং ওপেনার তামিম ইকবাল।

আরো পড়ুন : আশরাফুল থেকে শান্ত ; বিপিএলের একুশ সেঞ্চুরির গল্প

ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ)

মজার ব্যাপার হলো, বিশ্বের অন্যান্য ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোয় একেকটি দল একেকটি শহরকে প্রতিনিধিত্ব করলেও সিপিএলের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি একদম উল্টো। এখানে একেকটি দলের নাম করা হয়েছে একেকটি দেশের নামের সঙ্গে মিল রেখে। কারণটাও বেশ স্বাভাবিক। ক্রিকেটের অভিজ্ঞান ব্যতীত আর কোথাও ওয়েস্ট ইন্ডিজ নামের প্রচলন নেই। সাধারণত ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের দেশগুলো থেকে বাছাই করা সেরা খেলোয়াড়রাই এখানে খেলার সুযোগ পান। আর নির্বাচিত এসব খেলোয়াড়দের বেশিরভাগই হন প্রচন্ড শক্তিশালী। যেকারণে আইপিএল, বিপিএল থেকে শুরু করে টি-টেন লিগ – বিশ্বখ্যাত সবগুলো টি-টোয়েন্টি লিগে ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটাররা থাকেন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে।

কিন্তু বিদেশ রাঙিয়ে এসে নিজেদের ঘরোয়া ক্রিকেটের রেকর্ডসকে খু্ব একটা সমৃদ্ধ করতে পারেননি ক্রিস গেইলরা। সিপিএলের আট আসর এখন পর্যন্ত মাত্র ১৭টি সেঞ্চুরির দেখা মিলেছে। এরমধ্যে ক্রিস গেইল এবং ডোয়াইন স্মিথ মিলেই চারটি চারটি করে মোট আটটি সেঞ্চুরি যোগ করেছেন। অবশ্য সিপিএলে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোরের মালিক হচ্ছেন ব্র্যান্ডন কিং। যিনি গতবছর বার্বাডোজের বিপক্ষে অপরাজিত ১৩২ রানের অসাধারণ ইনিংসটি খেলেছিলেন।

পাকিস্তান সুপার লিগ (পাকিস্তান)

ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের জগতে পিএসএল এখনো রীতিমতো পিচ্চি বাচ্চা। সবেমাত্র সফলভাবে চারটি মৌসুম পার করেছে তারা। অন্যদিকে করোনা বাঁধায় পঞ্চম পর্বটি সেমিফাইনালের আগেই স্থগিত হয়ে গেছে। যা হোক, এরপরও এপর্যন্ত মোট আটবার কোনো ব্যাটসম্যান পিএসএলে এক ম্যাচে শতাধিক রান সংগ্রহ করেছেন। যাদের মধ্যে তিনটিই এসেছে কামরান আকমলের ব্যাট থেকে। অপরদিকে এই আটজনের মধ্যে সর্বোচ্চ রান স্কোর করেছিলেন কলিন ইনগ্রাম (১২৭*)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *