বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছিলেন যাঁরা

ফিচার

স্বাধীনতা পূর্ব সময়ে অন্যান্য সবকিছুর মতো খেলাধুলার ক্ষেত্রেও পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীরা বাঙালিদের সঙ্গে চরম বৈষম্য করতেন। বড়লোকের খেলা ক্রিকেটে সেসময় জাতীয় দলে বাঙালিদের অংশগ্রহণ ছিল অতি নগণ্য। কালেভদ্রে তাও যে দুয়েকজন দলে সুযোগ পেতেন, তারাও কয়েক ম্যাচ খেলেই কালের গর্ভে হারিয়ে যেতেন। যার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও। এমনকি নব্বইয়ের দশকের শেষ পর্যন্ত ফুটবল ছিল এদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। এরমধ্যেও একদল লোক টেলিভিশনের পর্দায় ক্রিকেট দেখলেও, সিংহভাগেরই সমর্থন যেত প্রতিবেশী দেশ ভারত কিংবা পাকিস্তানের প্রতি। কিন্তু দেশীয় ক্রীড়াঙ্গনে পরিবর্তনের এক নতুন ধারা আসতে থাকে ১৯৯৭ সালের পর থেকে যখন টাইগাররা প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলার মর্যাদা অর্জন করে। অবশ্য আইসিসির সহযোগী সদস্য হিসেবে টাইগারদের অন্তর্ভুক্তি হয়েছিল সেই ১৯৭৭ সালেই। অন্যদিকে ১৯৮৬ সাল থেকেই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে আসছে। আর আন্তর্জাতিক অভিষেকের পর গত তিন দশকে প্রায় ছয়শোর মতো ম্যাচ খেলে ফেলেছে টাইগাররা। দীর্ঘ এসময়ে বাংলাদেশের অর্জনের তালিকাটা যেমন লম্বা হয়েছে, তেমনি বীরদের সারিটাও আকারে বেড়েছে।

তবে তাঁদের মধ্যে সবসময়ই অগ্রগণ্য হয়ে রইবেন যাঁরা কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের মধ্যে প্রথমবারের মতো কোনো প্রাপ্তি অর্জন করেছেন। তাই আজকের আয়োজনের মাধ্যমে চলুন জেনে আসি তিন ফর্ম্যাটে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম ম্যাচ সেরাদের বীরত্বগাঁথা।


আতাহার আলি খান (বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা ওয়ানডে সিরিজ, ১৯৯০)

এপ্রজন্মের সন্তানদের কাছে আতাহার আলি খান পরিচিত একজন ধারাভাষ্যকার হিসেবে। এরমধ্যে আবার অনেকে তাঁকে চিনেছেন ২০১৫ বিশ্বকাপে মাহমুদউল্লাহর টানা সেঞ্চুরির পর তাঁর বলা ‘ব্যাক টু ব্যাক হানড্রেড’ কথাটির মাধ্যমে। কিন্তু ধারাভাষ্যকার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করার আগে আতাহার আলি খান একসময়ে ছিলেন বাংলাদেশের সেরা ব্যাটসম্যানদের মাঝে একজন। এমনকি বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম ম্যাচ সেরা ক্রিকেটারও তিনি। ১৯৯০ সালের ৩১শে ডিসেম্বর, এশিয়া কাপের বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা ম্যাচের মাধ্যমে তিনি এই সম্মানটি অর্জন করেছিলেন। সেদিন টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে অরবিন্দ ডি সিলভা এবং অধিনায়ক অর্জুনা রানাতু্ঙ্গার দারুণ ইনিংসের ওপর ভর করে টাইগারদের সামনে ২৪৯ রানের বড় সংগ্রহ দাঁড়া করেছিল লঙ্কানরা। অন্যদিকে বিশাল এই লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে বরাবরের মতো এবারো বেশ হিমশিম খেতে থাকেন বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানরা। তবে চারে ব্যাট করতে নামা আতাহার আলি খান ছিলেন এক্ষেত্রে একদম ব্যতিক্রম। সেদিন মাত্র ৯৫ বল খেলে ৮২.১০ স্ট্রাইকরেটে ৭৮ রানের অপরাজিত এক ইনিংস খেলে ম্যাচের শেষ মুহূর্ত লড়াই চালিয়ে যান তিনি। ফলে দিনশেষে ৭১ রানের বিরাট ব্যবধানে শ্রীলঙ্কা ম্যাচটিতে জিতে গেলেও, নির্বাচকদের নজরে ম্যাচ সেরা নির্বাচিত হয়েছিলেন আতাহার।

জাভেদ ওমর বেলিম (বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে টেস্ট সিরিজ, ২০০১)

টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশ তখন রীতিমতো দুগ্ধপোষ্য শিশু। তাই যেকোনো দলের বিরুদ্ধেই লড়াই চালিয়ে যাওয়াটা সেসময় বাংলাদেশের জন্য ছিল বড়রকমের চ্যালেঞ্জিং বিষয়। এমন সময় জিম্বাবুয়ে সফরে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ খেলার পাশাপাশি দুই ম্যাচের একটি টেস্ট সিরিজও খেলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বিসিবি। যেখানে প্রথম টেস্টেই ওপেনার হিসেবে অভিষিক্ত হওয়া জাভেদ ওমর বেলিম সবাইকে চমকে দিয়ে বসেন। প্রথম ইনিংসেই তাঁর খেলা খেলা ৬৮ রানের দারুণ ইনিংসের সুবাদে স্কোরবোর্ডে ২৫৭ রান সংগ্রহ করতে সক্ষম হয় টাইগাররা। পরে অবশ্য বোলারদের ব্যর্থতায় সেই ইনিংসেই ২০০ রানের বড় লিড নিয়ে নেয় স্বাগতিকরা। আর এবারো ১৬৮ বলে অপরাজিত ৮৫ রানের আরেকটি অসাধারণ ইনিংস খেলে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আশা দেখাচ্ছিলেন বেলিম। কিন্তু ক্রিকেট হচ্ছে একটি দলীয় খেলা। তাই এখানে একজনের পারফর্ম্যান্সের মাধ্যমে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করা হয় না। যেকারণে দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেবার ইনিংস ও ৩২ রানের ব্যবধানে লজ্জাজনকভাবে বাংলাদেশ ম্যাচটিতে হেরে যায়। তবে দুর্দান্তভাবে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সুবাদে অভিষেক ম্যাচেই প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে টেস্টে ম্যাচ সেরার পুরষ্কারটি পেয়ে যান জাভেদ ওমর বেলিম।

মাশরাফি বিন মর্তুজা (বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে টি-টোয়েন্টি সিরিজ, ২০০৬)

শোনা যায়, ছোট ফর্ম্যাটের ক্রিকেটকে মাশরাফির কাছে কখনোই ভালো লাগেনি। কিন্তু তারপরও দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্য অনেককিছুর মতো টি-টোয়েন্টিতে প্রথমবারের মতো ম্যাচ সেরা হয়েছিলেন মাশরাফি। ২০০৬ সালের ২৬ নভেম্বর খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামে একমাত্র টি-টোয়েন্টিতে টসে জিতে প্রথমে বোলিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সফরকারী জিম্বাবুইয়ানরা। অন্যদিকে প্রথমে ব্যাট করতে নামা বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা নিয়মিত আসা-যাওয়ার মাঝে থাকলেও দলের জন্য একরকম ঢাল হয়ে দাঁড়ান ছয়ে নামা মাশরাফি বিন মর্তুজা। তিনি মাত্র ২৬ বল খেলে ২ ছক্কা ও ২ চারের মারে ৩৬ রানের একটি ঝড়ো ইনিংস খেলে বাংলাদেশের স্কোর বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখেন। আবার পরবর্তিতে বল হাতেও ৪ ওভারে ২৯ রানের খরচায় ব্রেন্ডন টেইলরের গুরুত্বপূর্ণ উইকেটটি শিকার করে বাংলাদেশকে টি-টোয়েন্টি অভিষেকেই ৪৩ রানের ব্যবধানে বড় জয় পাইয়ে দেন তিনি। ফলে দিনশেষে ম্যাচ সেরার ক্রেস্টটির মালিকও হয়ে যান নড়াইল এক্সপ্রেস।

উল্লেখ্য, বিশ্বকাপে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ সেরা নির্বাচিত হয়েছিলেন খালেদ মাহমুদ সুজন। আর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ক্ষেত্রে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছিলেন মোহাম্মদ আশরাফুল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *