১৮৪৪ থেকে ২০২০ – ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা সাতটি টুর্নামেন্টের গল্প

ক্রিকেট

ইতিহাসের প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচটি আয়োজিত হয়েছিল ১৮৪৪ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর। কানাডা এবং আমেরিকা সেবার যখন মাঠে নেমেছিল, তখনো পর্যন্ত ফুটবল, হকি, গোল্ফ বা টেনিসের মতো খেলাগুলো আন্তর্জাতিকতার গন্ধটুুকু পর্যন্ত পায়নি। তবে শিল্পবিপ্লব পরবর্তি রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোর কারণে ইংরেজদের খেলা ক্রিকেটের প্রসার যেন হঠাৎ করেই কমে আসতে থাকে। যে কারণে বিশ শতাব্দিতে এসে ফুটবল কিংবা টেনিসের মতো খেলাগুলো যেভাবে তরতর করে জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল, ক্রিকেটের ক্ষেত্রে তেমনটি হয়নি। যদিও ফুটবলের আন্তর্জাতিক সংস্থা ফিফার প্রতিষ্ঠার মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় ক্রিকেটের অভিভাবক আইসিসির জন্ম হয়েছিল। যা হোক, তারপরও ইতিহাসের পাতায় প্রথম আন্তর্জাতিক দ্বিপাক্ষিক ম্যাচের তালিকায় ক্রিকেটের অবস্থান সবসময়ই উপরে থাকবে।

তাছাড়া সুদীর্ঘ এসময়ে ক্রিকেটের বইয়েও রচিত হয়েছে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির চমৎকার ইতিহাস। আয়োজিত হয়েছে প্রচুর আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া টুর্নামেন্ট। সেসব থেকেই বাছাই করা সেরা সাতটি টুর্নামেন্টকে ঘিরেই থাকছে এবারের আয়োজন।


সাত | এশিয়া কাপ

ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম দিককার বহুজাতিক টুর্নামেন্টগুলোর মাঝে একটি হচ্ছে এশিয়া কাপ। এশিয়ার সেরা ছয়টি ক্রিকেট খেলুড়ে দেশগুলোর মধ্যে ২ বছর পর পর এই প্রতিযোগিতাটি আয়োজিত হয়ে থাকে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাটিতে টুর্নামেন্টটির সূচনা হয়েছিল ১৮৮৪ সালে। সেবার আকর্ষণীয় এই ট্রফিটির জন্য লড়েছিল ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার জাতীয় দল। পরবর্তি আসরে বাংলাদেশকেও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এভাবে আস্তে আস্তে টুর্নামেন্টটিতে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা গিয়ে ছয়ে ঠেকেছে। যে কারণে আয়োজনের সু্বিধার্থে বর্তমানে টুর্নামেন্টটিকে তিনটি পর্বে ভাগ করা হয়েছে। আবার ইদানিং টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের তুমুল জনপ্রিয়তা এবং ছোট ফর্ম্যাটের বিশ্বকাপকে সামনে রেখে ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি দুই ফর্ম্যাটেই এশিয়া কাপ আয়োজিত হচ্ছে। অন্যদিকে এশিয়ার সাধারণ মানুষের ক্রিকেটের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার কারণে টুর্নামেন্টটি আজও আগের মতোই দর্শক সমর্থন পেয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে, এই এশিয়া কাপের সুবাদেই বিশ্ববাসী প্রতি দুই বছরে অন্তত আরেকটিবার হলেও ভারত-পাকিস্তানের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে উপভোগ করতে পারে।

ছয় | চ্যাম্পিয়ন্স লিগ টি-টোয়েন্টি

ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের দুনিয়ায় এ ছিল এক অভিনব সংযোজন। বিশ্বের অন্যতম সেরা তিনটি দল – অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটের সেরা দলগুলোকে নিয়ে ২০০৯-১৪ সাল পর্যন্ত এই টুর্নামেন্টটি প্রতিবছর আয়োজিত হতো। তিন দেশের সেরা ছয় দলের এই লড়াইটি সেসময়ের দর্শকেরা বেশ উপভোগ করেছিলেন এমনকি সেটি সেসময়কার ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের সবচেয়ে দামি টুর্নামেন্ট হিসেবেও রেকর্ড গড়েছিল। কিন্তু তবুও আয়োজকদের কাছে দর্শকের সংখ্যাটা নেহাত কম বলে মনে হয়েছিল এবং যেকারণে ২০১৪ সালের পর থেকে আর কখনোই টুর্নামেন্টটি আয়োজিত হয়নি। আবার ২০০৮ সাল থেকেই চ্যাম্পিয়ন্স লিগ টি-টোয়েন্টির আসর শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ঐবার ভারতের মুম্বাইয়ে সংঘঠিত জঙ্গি হামলার কারণে আয়োজকরা ভারতে টুর্নামেন্টটি আয়োজন করতে পারেননি।

পাঁচ | ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ

প্রায় ১৩৭ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হিসেবে ক্রিকেট সবসময়ই সেখানে আলাদা প্রাধান্য পেয়ে আসছে। এরই সুবাদে বৈশ্বিক পর্যায়ে বড়রকমের কোনো টুর্নামেন্ট আয়োজনে সবসময়ই এগিয়ে আছে আমাদের প্রতিবেশী দেশটি। বিশেষ করে শুধুমাত্র নিজেদের ঘরোয়া ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ আইপিএলকে দিয়েই বিশ্ব ক্রিকেটের বড় একটি অংশ ধারণ করে রেখেছে তারা। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দামি ঘরোয়া ক্রিকেট লিগটিতে খেলার জন্য বিশ্বখ্যাত তারকারাও যেমন মরিয়া হয়ে থাকেন, তেমনি ভারতের বাইরেও এর রয়েছে ব্যাপক দর্শক চাহিদা। যেকারণে তালিকার একমাত্র ঘরোয়া ক্রিকেট লিগ হিসেবে উঠে এসেছে আইপিএলের নাম।

চার | আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি

খোদ আইসিসি কর্তৃক আয়োজিত এই টুর্নামেন্টটি মিনি বিশ্বকাপ হিসেবেও বেশ পরিচিত ছিলো। ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ের সেরা আটটি দলকে নিয়ে প্রতি চার বছর অন্তর অন্তর জাঁকজমকপূর্ণ এই টুর্নামেন্টটি আয়োজিত হয়ে আসছিলো সেই ১৯৯৮ সাল থেকেই। মজার ব্যাপার হলো, এই চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির অভিষেকটা কিন্তু হয়েছিল আমাদের বাংলাদেশের বুকেই। অবশ্য দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ২০১৭ সালের পর থেকে আইসিসির আয়োজন করা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ এই টুর্নামেন্টটিও বন্ধ হয়ে যায় এটির প্রতি দর্শকের চাহিদা কম থাকার কারণে। এর বদলে এখন থেকে আইসিসি টানা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কেননা ছোট ফর্ম্যাটের খেলাই ইদানিং দর্শকরা বেশি পছন্দ করছেন। তবে দুর্দান্ত এক স্মৃতির কারণে টুর্নামেন্টটিকে এপ্রজন্মের বাংলাদেশি ক্রিকেটপ্রেমিরা হয়তো কোনোদিনও ভুলতে পারবেন না। কারণ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির বিদায়ী আসরেই যে মাশরাফিবাহিনী প্রথমবারের মতো কোনো বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে খেলেছিল!


তিন | অ্যাশেজ সিরিজ

‘চলুন একটা ক্রিকেট সিরিজ খেলি। আয়োজন, দর্শক সংখ্যা – সবই দারুণ রকমের হবে। তবে পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হবে ছোট্ট একটি কৌটা ভর্তি কিছু ছাই। রাজি আছেন? ’

শুনতে বেশ অবাক লাগলেও গত ১৩৮ বছর ধরে,, এরকম একটি ট্রফির জন্যেই প্রতি দুই বছর পরপর টেস্ট সিরিজ আয়োজন করে চলেছে অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ড। এখানে কোনো এক আসরে যেই দল জয়ী হবে, তারাই ট্রফিটি পরবর্তি দুই বছরের জন্য নিজেদের দখলে রাখবে। এরপর তাদের ঘরের মাটিতেই গড়াবে পরবর্তি আসর। সেখানে যদি আবার প্রতিপক্ষ জয় লাভ করে, তবে ট্রফিটি তারা নিজেদের সঙ্গে নিয়ে যাবে এবং তার পরেরবারের দেখাটা সেই দেশেই হবে। এমনটাই চলে আসছে সাড়ে এগারো যুগ ধরে। অবশ্য ঐতিহাসিক এই সিরিজটির পিছনে একটি মজার গল্পও রয়েছে। ১৮৮২ সালে সদ্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখা অস্ট্রেলিয়ার কাছে ইংলিশরা যখন লজ্জাজনকভাবে হেরে যায়, তখন ইংল্যান্ডের একটি পত্রিকায় ইংল্যান্ডের ক্রিকেটের মৃত্যুর একটি সংবাদ ছাপানো হয়েছিল এভাবে, ‘ইংল্যান্ডের ক্রিকেটের অপমৃত্যু ঘটেছে। এই মৃতদেহটিকে এখন দাহ করা হবে এবং তার ছাই অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে যাওয়া হবে।’ ব্যস, এই বুদ্ধি থেকেই তখন ঐম্যাচটিতে ব্যবহৃত স্ট্যাম্পের বেলগুলোকে জ্বালিয়ে তার ছাই ছোট্ট একটি রুপার কাপে বন্দি করে অস্ট্রেলিয়ানদের দিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তিতে এই ট্রফিকে ঘিরেই সৃষ্টি হয় ক্রিকেট ইতিহাসের অদ্ভুতুড়ে এক অধ্যায়ের।

দুই | টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ

২০০৪ সালে জন্ম লাভ করার পর থেকে খুব অল্পসময়ের মধ্যেই গোটা বিশ্বে তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট। যেকারণে ২০০৭ সাল থেকে টি-টোয়েন্টি ফর্ম্যাটকে ঘিরেও আরেকটি বিশ্বকাপ আয়োজনের উদ্যোগ নেয় আইসিসি। যেটিকেও দর্শকরা প্রথম থেকেই আপন করে নেন। বিশ্বব্যাপী ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজনের জন্যও যেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছিলো। আর এমনটা চলতে থাকলে খুব দ্রুতই হয়তো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বিশ্বের সেরা ক্রিকেট টুর্নামেন্টে পরিণত হয়ে যাবে কেননা টি-টোয়েন্টি ফর্ম্যাটে খেলার মর্যাদাটা যে আইসিসি সম্প্রতি তাদের সবকয়টি সদস্য দলকেই দিয়ে দিয়েছে।

এক | ওয়ানডে বিশ্বকাপ

প্রতি চার বছর পরপর আয়োজিত হওয়া ওয়ানডে বিশ্বকাপটাই হচ্ছে ক্রিকেট বিশ্বের এযাবতকালে আয়োজিত সেরা টুর্নামেন্ট। সোনা এবং রূপার মিশ্রণে তৈরি লোভনীয় এই ট্রফিটির জন্য সবসময়ই বিশ্বের সেরা কিছু দলের মধ্যে দুর্দান্ত প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়। আর বিশ্বের যেকোনো ক্রিকেট খেলুড়ে দলই অন্তত একবার হলেও ট্রফিটি নিজেদের শোকেসে এনে রাখতে চায়। অবশ্য আইসিসি এপর্যন্ত ঐতিহ্যবাহী বিশ্বকাপের আয়োজনের ধরনেও বেশকিছু পরিবর্তন এনেছে। এই যোমন – সর্বশেষ বিশ্বকাপটি খেলা হয়েছে রাউন্ড রবিন পদ্ধতিতে, মাত্র দশটি দলের মধ্যে।

এদিকে মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্টটির ইতিহাসে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সাফল্য হচ্ছে ২০১৫ সালের অস্ট্রেলিয়া বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *