আসিফ করিম: ৩৯ বছর বয়সী এক বুড়োর বিশ্বজয়ের গল্প

ফিচার

একটা সময় কী দারুণ দলটাই না ছিল কেনিয়া! সত্যিকারের ‘জায়ান্ট কিলার’! দৈত্য বধের দুর্বিনীত সাহসী সৈনিক। যদিও বর্তমান প্রজন্মের কেউ হয়ত বিশ্বাস করতে চাইবেনা বর্তমান কেনিয়া ক্রিকেট দলকে দেখে। তারা হয়ত ভাববে এসব শুধুই রুপকার গল্প!


এই কেনিয়া ক্রিকেট দল ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে এসেই হারিয়েছিল ব্রায়ান লারার ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। তারা কি বিশ্বাস করবে কেনিয়া হারিয়েছিল শচীন-দ্রাবিড়দের ভারতকে সেটাও দুইবার। তারা কি বিশ্বাস করবে, এই কেনিয়াই একটি বিশ্বকাপে একমাত্র টেস্ট খেলুড়ে দেশ না হয়েও খেলেছিল বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল।

বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই বিশ্বাস করবেনা কেনিয়ার এসব বিজয় গাঁথার গল্প, কেননা তারা জানেনা কেনিয়া ক্রিকেট দলের একজন আসিফ করিম ছিল। যিনি ৩৯ বছর বয়সেও জয় করেছিলেন ক্রিকেট বিশ্ব। তারা জানেনা সেই আসিফ করিমের গল্প।

বর্তমান প্রজন্মই কেন? সেই তখন ২০০৩ সালে তখনও তো ক্রিকেট বিশ্ব জানতোনা আসিফ করিমের কথা। একজন পেছন থেকে একটি দেশকে যে ২০ বছর ধরে কতটা সেবা দিয়ে আসছিলেন সেটা তো মানুষ জানতে পেরেছিল ২০০৩ বিশ্বকাপের মাধ্যমে। একজন আসিফ করিম যে ৩৯ বছরেও বিশ্ব জয়ের ক্ষমতা রাখে সেটা তিনি প্রমাণ করেছিলেন। তারা এটাও জানতোনা এই আসিফ করিমই তার দেশের জন্য টেনিস প্রতিযোগিতাতেও দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

কেনিয়ার এক ক্রীড়ামোদী পরিবারে আসিফ করিমের জন্ম। তার পিতা ইউসুফ করিম কেনিয়ার খ্যাতনামা টেনিস খেলোয়াড়সহ ক্রিকেটার ছিলেন। তারা ছিলেন ভারতীয় বংশদ্ভূত। বাবা টেনিস খেলোয়াড় হওয়ায় তরুণ বয়সে টেনিসে বৃত্তি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গমন করেন।

ডেভিস কাপে মিশরের বিপক্ষে কেনিয়ার প্রতিনিধিত্ব করে তিন খেলায় অংশ নেন। জুনিয়র টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে ফ্রেঞ্চ ওপেনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৮৮ সালে ডেভিস কাপের প্রতিযোগিতায় মিশরের বিপক্ষে অংশগ্রহণ করেন। তিনি দুটি একক ও একটি দ্বৈত খেলায় অংশ নিয়েছিলেন। নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্টস কাপে তিনি নেতৃত্ব দেন দেশকে। পরবর্তীতেই এই আসিফ করিমই কেনিয়ার ক্রিকেটে রাজপুত্র হয়ে উঠেন।

কেনিয়ার মোম্বাসায জন্মগ্রহণ করা আসিফ করিমের ছোট থেকেই স্বপ্ন ছিল, মোম্বাসাকে বিশ্বে তুলে ধরবেন তিনি। এই মোম্বাসার রাস্তায় ঘুরে আসিফ করিফ স্বপ্ন দেখতেন, একসময় এই মোম্বাসার রাজা হবেন তিনি। মোম্বাসার প্রতিটি জায়গায় লেখা থাকবে তারই নাম। পরবর্তী এই স্বপ্ন পূরণও হয় আসিফ করিমের।

যদিও ২০০৩ সালের বিশ্বকাপে যদি না খেলতেন তবে তাকে হয়ত কেউই চিনতোনা। কেননা আসিফ করিম তো ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ১৯৯৯ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপ শেষে অবসরের ঘোষণা দেন।

প্রায় চার বছর পর ২০০৩ বিশ্বকাপের আগে ২০০২ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর, তথা আসিফ করিমের জন্মদিনের পরের দিনে সন্ধ্যায় ফোন বাঁজছিল, আসিফ করিম ফোন তুলছিলেন না। বার বার রিং হওয়ার পর তার মেয়ে ফোনটি রিসিভ করে৷ ফোন করেছিলেন ছিল সেই সময়ের কেনিয়া ক্রিকেটের নির্বাচকদের চেয়ারম্যান আসিফ পাপামশী।

আসিফ পাপামশী ছিলেন আসিফ করিমের বন্ধু। ঠিক চার বছর আগে এই পাপামশী, আসিফকে বলেছিলেন তার অবসরের ব্যাপারে ভাবা উচিত। তখন ক্যারিয়ারে ২০ বছর পার করেছেন করিম। আর যদি অবসর না নেন তবে হয় তাকে দল থেকে বাদ দেওয়া হবে। তখন অবসর নেন করিম। চার বছর বাদে আবারো বিশ্বকাপ খেলতে করিমকে ডাকছেন পাপামশী। দেশের জন্য আরেকবার ক্রিকেটে ফেরার অনুরোধ। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ আলোচনা শেষে হ্যা বলে দেন আসিফ করিম। যদিও আসিফ করিম সে সময় বাস্তব জীবনে ছিলেন একজন ইনস্যুরেন্সের এজেন্ট।

সেই চাকুরী ছেড়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত ২০০৩ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপে দলের শক্তি বৃদ্ধিকল্পে পুণরায় অংশগ্রহণ করেন। ৩৯ বছর বয়সে ক্যারিয়ারে ২৩ তম বর্ষে ফিরেন আবারো ক্রিকেটে। আর তাতেই ২০০৩ বিশ্বকাপের নায়ক বণে যান আসিফ।

নব্বই দশকে আসিফের স্লো লেফট আর্ম বোলিং বেশ কার্যকর ছিল। সেটা কতটা? উত্তর খুঁজতে বিখ্যাত সেই ২০০৩ বিশ্বকাপের সুপার সিক্সের অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটার কথা না বললেই নয়। সেদিন প্রতাপশালী অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপে রীতিমতো কাঁপুনি ধরিয়ে দিয়েছিলেন আসিফ।

৮.২ ওভার বোলিং করেছেন। এর মধ্যে ছয়টাই ছিল মেইডেন ওভার। রান দিয়েছেন মাত্র সাতটা, উইকেট তিনটা। আধুনিক ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে সেটা অন্যতম সেরা এক বোলিং ফিগার।

২০০৩ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে সেমিফাইনাল হারের পরই আসিফ ক্রিকেটকে বিদায় বলে দেন। মজার ব্যাপার হলো, ১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপে এই ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়েই শুরু হয়েছিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার পথচলা। আসিফ তার অভিষেকের প্রথম বলেই নিয়েছিলেন উইকেট। পুরো ক্যারিয়ারে নিয়েছেন, মাইকনআথারটন, শোয়েব মোহাম্মদ, রিদওয়ানউজ্জামান, রাহুল দ্রাবিড়, রিকি পন্টিংয়ের মতো ক্রিকেটারদের উইকেট।

আসিফের পরের প্রজন্মও ক্রিকেটে এসেছে। আসিফের ছেলে ইরফান করিম এখন কেনিয়া ক্রিকেট দলের নিয়মিত সদস্য। ইতোমধ্যেই ৯ ওয়ানডে খেলেছেন দেশের হয়ে। যেখানে ২ শতক ও ১ টি অর্ধশতক সহ করেছেন ৪৪ গড়ে ৩৯৬ রান।

আসিফ করিম তাঁর ক্রিকেট জীবনে মোট ৩৪ টি একদিনের ম্যাচ খেলেছেন। তাতে রান করেছেন ২৮৮ এবং উইকেট পেয়েছেন ২৭ টি। তিন-তিনটি বিশ্বকাপে খেলেছেন তিনি। ১৯৯৬, ১৯৯৯ এবং ২০০৩ সালে।

তথসূত্র: ইন্টারনেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *