বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়ের ১৬ বছর

বাংলাদেশ ক্রিকেট

আজ ১০ জানুয়ারি, বাংলাদেশের জন্য চিরস্মরণীয় ঐতিহাসিক একটি দিন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় অর্জিত হলেও মহান নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন হয় ১৯৭২ সালের আজকের এইদিনে। সেদিন সাড়ে ৭ কোটি মানুষের কাছে ফিরে আসার অতি আবেগ আর আনন্দের দিন। অতুলনীয় সেই আনন্দের দিনে দেশের ক্রিকেট ইতিহাসেও এক মহা অর্জন এসেছিল। ২০০৫ সালের এই দিনে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল পায় তাদের টেস্ট ক্রিকেটের প্রথম জয়।

চট্টগ্রামের এম.এ.আজিজ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সেই ঐতিহাসিক টেস্ট ম্যাচে টাইগাররা ২২৬ রানে জিম্বাবুয়েকে পরাজিত করে। টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার ৪ বছর পর প্রথম জয়ের স্বাদ পায় বাংলাদেশ।

টসে জিতে আগে ব্যাট করতে নামা বাংলাদেশ সেদিন দেখিয়েছিল ব্যাটসম্যানদের ধারাবাহিকতার এক নিদর্শন। প্রথম ইনিংসে কোনো সেঞ্চুরি না থাকা সত্ত্বেও সবার অবদানে ৪ অর্ধশতকে ৪৮৮ রান তুলে ফেলে হাবিবুল বাশারের নেতৃত্বাধীন দল।

সর্বাধিক ৯৪ রান করে নার্ভাস নাইন্টিজে কাঁটা পড়েছিলেন অধিনায়ক বাশার। একেবারে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি বীরের মতোই খেলেছিলেন। রাজিন সালেহ খেলেন চরম ধৈর্যশীল ৮৯ রানের এক ইনিংস। ৮ নম্বরে ব্যাট করতে নেমে মোহাম্মদ রফিক খেলেছিলেন ৬৯ রানের দারুণ এক ইনিংস। উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান নাফিস ইকবাল করেন ৫৬ রান।

আরও ২টি অর্ধশত অল্পের জন্য পাওয়া হয়নি বাংলাদেশের। ক্রাইসিস ম্যান হিসেবে খ্যাত খালেদ মাসুদ পাইলট ৪৯ ও বর্তমানে টাইগারদের ওয়ানডে অধিনায়ক নড়াইল এক্সপ্রেস মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা ৪৮ রান করে আউট হন। আর তাতে প্রায় ৫০০ ছুঁই ছুঁই স্কোর গড়ে বাংলাদেশ, যা তৎকালীন সময়ে দলের সর্বাধিক টেস্ট রানের রেকর্ড।

জিম্বাবুয়ে তাদের প্রথম ইনিংসে মো. রফিক ও মাশরাফীর বোলিং নৈপুণ্যে ৩১২ রানে অলআউট হয়ে যায়। সফরকারীদের পক্ষে অধিনায়ক টাটেন্ডা টাইবু ৯২ ও এল্টন চিগাম্বুরা ৭১ রানের সংগ্রামী এক ইনিংস খেললেও বাকি ব্যাটসম্যানরা কেউ সুবিধা করতে পারেননি। রফিক ৫টি ও মাশরাফি ৩টি উইকেট দখল করেন। আর তাতে প্রথম ইনিংসে ১৬৭ রানে এগিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামে বাংলাদেশ।

দ্বিতীয় ইনিংসে অবশ্য বাংলাদেশ জিম্বাবুয়ের বোলিং আক্রমণে খুব বেশি সুবিধা করতে পারেনি। ব্যাট হাতে দারুণ খেলা এল্টন চিগাম্বুরা ৫ উইকেট ও ডগলাস হন্ডুর ৩ উইকেট লাভ করেন। কিন্তু আবারো মিস্টার ফিফটি নামে খ্যাত হাবিবুল বাশার অধিনায়কোচিত অর্ধশত রানের ইনিংস খেলে দলের রান ২০০ পার করেন। তার অপরাজিত ও দলীয় সর্বাধিক ৫৫ রানের কল্যাণে ৯ উইকেটে ২০৪ রান করে ইনিংস ঘোষণা করে বাংলাদেশ। আর জিম্বাবুয়েকে ছুড়ে দেয় ৩৮১ রানের বিশাল লক্ষ্য।

জিম্বাবুয়ে তাদের দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে স্পিন বিষে নীল হয়ে যায়। এক্ষেত্রে এনামুল হক জুনিয়র অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তার স্পিনঘূর্ণির সামনে ন্যূনতম প্রতিরোধ গড়তে পারেনি জিম্বাবুয়ে। রীতিমত দিশেহারা অবস্থা হয় তাদের।

মাসাকাদজা ৫৬ আর ব্র্যান্ডন টেলরের ৪৪ ছাড়া আর কোন উল্লেখ করার মতো ব্যক্তিগত ইনিংস নেই। এনামুল হকের ৬ উইকেট দখলের কল্যাণে মাত্র ১৫৪ রানের মধ্যেই গুটিয়ে যায় জিম্বাবুয়ের ইনিংস। ফলে ২২৬ রানের বিশাল ব্যবধানে জয় লাভ করে বাংলাদেশ পেয়ে যায় টেস্ট ইতিহাসের প্রথম জয় চট্টগ্রামের মাটিতে।

প্রথম টেস্টে জয়ের আনন্দে ভাসতে থাকে সারাদেশ। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া ছড়িয়ে পড়ে উল্লাসের জোয়ার। আর এই জোয়ারে এগিয়ে চলেছে ক্রিকেটে আমাদের এগিয়ে চলা। নানা উত্থান-পতনের মোকাবেলা করে বাংলাদেশ আজ প্রতিষ্ঠিত ও সমীহ জাগানিয়া একটি দল।

যদিও গত বছর টেস্ট ক্রিকেটের অতি নবীন সদস্য আফগানিস্তানের বিপক্ষে মিরপুরের মাঠে ২২৪ রানের বিশাল ব্যবধানে হারায় সাদা পোশাকের ক্রিকেটে বাংলাদেশের অতীতের যৎসামান্য অর্জনকেও সমর্থকদের কাছে তুচ্ছ মনে হতে থাকে। ভারত সফরে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে পা রাখা বাংলাদেশ যেন দুইটি টেস্টেই তিনদিনে ইনিংস ব্যবধানে হেরে প্রমাণ করে ছাড়লো অনেকটা সাত সাগর পাড়ি দিয়ে সৈকতে পড়ে থাকার মতোই তারা ১৯ বছরেও টেস্ট ক্রিকেট বুঝতেই চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

২০০০ সালে টেস্ট মর্যাদা পাওয়া বাংলাদেশ ক্রিকেট দল এখন পর্যন্ত এই ফরম্যাটে মোট ১১৭টি ম্যাচ খেলে ফেলেছে। সাদা পোশাকের ক্রিকেটে ১৯ বছরের পথচলায় টাইগারদের পারফরম্যান্স কতটা মলিন, তা বোঝানোর জন্য মোটা দাগে একটি মাত্র পরিসংখ্যান উল্লেখ করাই যথেষ্ট। ১১৭ টেস্টের মধ্যে পরাজয়ের সংখ্যাই ৮৮টি, যার মধ্যে ইনিংস পরাজয়ের সংখ্যাই ৪২টি। মাত্র ১৩ জয়ের পাশাপাশি ড্রয়ের সংখ্যা ১৬টি। অর্থাৎ মাত্র ২৯ টেস্টে পরাজয়ের স্বাদ বরণ না করে বাংলাদেশ মাঠ ছেড়েছে। ড্র টেস্টের কয়েকটি আবার বৃষ্টির বদান্যতায় কপালে জুটেছিল। প্রথম টেস্ট জিততে বাংলাদেশকে ৩৫তম টেস্ট ম্যাচ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ঐতিহাসিক সেই টেস্ট তারা জিতেছিল অনেকটাই খর্বশক্তির দল হয়ে যাওয়া জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে।

দুর্বল ক্রিকেট কাঠামো, খেলোয়াড়দের উপযুক্ত পাইপলাইন গড়ে না তোলা, দল গঠনে অনেকের অযাচিত হস্তক্ষেপ নিয়ে গণমাধ্যমে অনেক কথাই উঠে আসে। তবে অতীতের অর্জন নিয়ে আলোচনার সময় তার ভেতর থেকে যাওয়া ফাঁক নিয়ে তেমন কেউ কথা বলেন না। সঠিক ইতিহাস না জানলে কিংবা তা জেনে উপলব্ধির জায়গা মানসিকভাবে ধারণ না করলে একটা সময় কতটা ভুগতে হয় তার জ্বলন্ত উদাহরণ বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। তাই সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে, ক্রিকেটের জন্য সঠিক ও যোগ্য মানুষদের নিয়োগ দেয়া এখন অতি আবশ্যক হয়ে উঠেছে। সঠিক দিক-নির্দেশনার মাধ্যমে উত্তম পরিকল্পনা প্রয়োগের মাধ্যমে বিভক্তির মাঝেও গোটা দেশের মানুষকে এক সুতোয় বাঁধতে পারা ক্রিকেট যেন আবারো ফিরে পায় তার সোনালী সময়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *