মুলতানের সুলতান; চিরসবুজ ক্রিকেট নায়ক

জন্মদিন ফিচার

২০ আগস্ট, ২০০৬; ইংল্যান্ডের ওভালে ইংল্যান্ড বনাম পাকিস্তানের টেস্ট ম্যাচ চলাকালীন সময়ে আম্পায়ার ড্যারেল হেয়ারও বিলি ডক্ট্রভ হঠাৎ করেই হয়ে ওঠেন আক্রমণাত্মক। পাকিস্তান দলকে বল টেম্পারিংয়ের দায়ে মাঠেই অভিযুক্ত করেন তারা। এই অভিযোগ একদম সহ্য করতে পারেননি পাকিস্তানি কাপ্তান ইনজামাম উল হক। আম্পায়ের এমন অভিযোগে মাঠেই যেন ক্ষ্যাপা আগুন হয়ে যান ইঞ্জি, তৎক্ষনাৎ দল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন মাঠ থেকে। পরে ইংলিশদের জয়ী ঘোষণা করা হয়।

বল টেম্পারিং ইস্যুতে বাক বিতণ্ডায় ইনজামাম

হ্যাঁ, এরকমই আপোষহীন মানুষ ছিলেন বিশ্ব ক্রিকেটের বিগ ফ্যাট ম্যান ইনজামাম উল হক। ক্রিকেট মাঠে তার উত্তেজনার বহু নজির আছে। জন্মদিনে তাকে নিয়েই লিখা যাক কিছু টুকরো কথা…

১৯৭০ সালের ৩ মার্চ পাকিস্তানের মূলতানে জন্ম নেন এক সময়ের সাড়া জাগানিয়া পাকিস্তানি ক্রিকেটার ইনজামাম উল হক। তিনি পাকিস্তানের সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে নিজের নাম লিখিয়ে নিয়েছেন। হবেন ই না বা কেন, একদিনের ক্রিকেটে এখন অব্দি পাকিস্তানের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক যে তিনিই। এছাড়াও টেস্টেও সর্বোচ্চ রানের তালিকায় তিনে আছেন ইনজামাম; সামনে শুধু জাভেদ মিঁয়াদাদ আর ইউনিস খান। এখানেই শেষ নয়, এখন অব্দি পাকিস্তানের অন্যতম দলপতি হিসেবেও মানা হয় তাকে। এতো এতো সুনামের মালিক ইনজামামের পুরো ক্রিকেটীয় জীবনটাই ছিলো এক রহস্যের খামে মোড়া। তিনি মাঠে নামলেই ক্রিকেটভক্তদের চোখজোড়া কি এক অপার বিস্ময়ে চেয়ে রইতো। এই চাহনি কি তার বিশালদেহী গড়নের জন্যে নাকি অন্যকিছু সে প্রশ্নের উত্তর মেলা ভার।

১৯৯১ সালে একদিনের ক্রিকেটে অভিষেক হয় ‘মুলতানের সুলতান’ খ্যাত ইনজামাম উল হকের। নিজ দেশের মাটিতে ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে প্রথম মাঠে নামেন তিনি, সেই থেকেই ক্রিকেটে গোড়াপত্তন এই কিংবদন্তীর। শুরু থেকেই একটু একটু করে জানান দিচ্ছিলেন নিজের ব্যাটিং মুন্সিয়ানার। ক্রিকেটের বড় মঞ্চেই নিজেকে মেলে ধরেন ইঞ্জি। ১৯৯২ বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে তার করা ৩৭ বলে ৬০ রানের দূর্দান্ত ইনিংসের সুবাদেই ফাইনালে ওঠে পাকিস্তান। তার সেই ইনিংস ক্রিকেট বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা একটি ইনিংস হিসেবে এখনও বিবেচিত হয়।

কিউইদের বিপক্ষে মারকুটে ইনজামাম

এরপর ফাইনালেও তার ব্যাটিং নৈপুণ্যতায় (৩৫ বলে ৪২ রান) প্রথমবারের মতন শিরোপার মুখ দেখে পাকিস্তান।
একসময় একদিনের ক্রিকেটে সর্বোচ্চ সংখ্যক অর্ধশতকের (৮৩ টি) মালিক ছিলেন ইনজামাম;যদিও এখন নতুন এই রেকর্ড শচীনের (৯৬ টি)। এছাড়াও শচীন টেন্ডুলকারের পরে দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে একদিনের ক্রিকেটে দশ হাজারী ক্লাবে নাম লিখিয়েছিলেন তিনি। এছাড়াও ৩৭৮ টি ম্যাচ খেলে ১১৭৩৯ রান করেছিলেন ইনজি; এর মধ্যে ছিলো দশটি শতক। জীবনের শেষ ম্যাচেও নিজের কৃতিত্ব দেখিয়েছেন ইনজামাম। বিশাল দেহকে সাথে করেও তিনটি দূর্দান্ত ক্যাচ নিয়ে বিদায়ী ম্যাচ স্বরণীয় করে রাখেন এই তারকা।

টেস্টে ইনজামামের ডেব্যু হয় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৯৯২ এর এজবাস্টন টেস্টে। তার গুরুগম্ভীর ব্যাটিংয়ে স্বাগতিকদের ২-১ এ টেস্ট সিরিজ হারায় পাকিস্তানেরা। উক্ত সিরিজে সাদামাটা ব্যাটিং দেখালেও নিজের প্রতি সাদা পোশাকে আত্মবিশ্বাস সুদৃঢ় হয় ইনজামামের। এই আত্মবিশ্বাসের ফলেই পাকিস্তানের বহু টেস্ট জয়ের সাক্ষী ইনজামাম উল হক। টেস্টে তিন তিনবার বিশ্বসেরা ব্যাটসম্যান হবার রেকর্ড আছে তার।

টেস্টে সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে ব্যাট উঁচানো উনজামাম

১২০ টেস্টে ৮৮৩০ রান করেছেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে ২৫ টি শতক আর ৪৬ টি অর্ধশতক। টেস্ট ক্রিকেটে তার মতো এমন ক্লাসিক ব্যাটসম্যানকে খুব কমই দেখেছে ক্রিকেটবিশ্ব।

ছয় ফুট তিন ইঞ্চির বিশালদেহী ইনজামাম ব্যাটিংয়ে নামলে অবাক হয়ে তাকাতো সবাই। প্রায় দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে শক্ত হাতে এবং নির্ভরতার সাথে পাকিস্তানি মিডল অর্ডার আগলে রেখেছিলেন এই ব্যাটসম্যান। টেস্টে প্রায় ৫০ এবং ওডিআই’তে ৪০ এর কাছাকাছি গড় নিয়ে ক্যারিয়ার শেষ করেন ইঞ্জি। তার ব্যাটিং স্টাইলের জন্য ক্রিকেটবিশ্বে বহু ভক্ত কুড়িয়েছেন ইনজামাম। পেস বোলারদের জন্যও ত্রাস ছিলেন তিনি। ফাস্ট বোলারদের বিপক্ষে বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যানদের তালিকায় শীর্ষস্থানে আছেন ইনজামাম। কিন্তু বিশালদেহের জন্য একটা জায়গায় এসে বিপাকে পড়তে হয় তাকে। বহুবার হাস্যকরভাবে রানআউট হয়েছেন তিনি।

রান আউটের কবলে ইনজি

ওয়ানডেতে ৪০ বার রানআউটের সম্মুখীন হয়েছেন এই তারকা।

পাকিস্তানের অধিনায়কদের মধ্যে অন্যতম একটি নাম ইনজামাম উল হক। দলের হয়ে দীর্ঘ সময় অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এর মধ্যে বহু উত্থান পতনের সাক্ষী ছিলেন, কখনো হাসিয়েছেন, কখনো অবাক করেছেন আবার কখনও বিতর্কিতও হয়েছেন।
কিন্তু অধিনায়কত্বের শেষের দিকটা একরকম অভিশাপই ছিলো ইনজামামের জীবনে। ২০০৭ বিশ্বকাপে নবাগত আয়ারল্যান্ডের কাছে হেরে গ্রুপ পর্ব থেকেই ছিটকে পড়ে দলটি। এই হারের কারণে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়ে তৎক্ষনাৎ অবসরের সিদ্ধান্ত নেন ইনজি।

আইরিশদের বিপক্ষে হেরে হতাশ মুহুর্তে ইনজামাম

সারা জীবনের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের শেষটা দুঃস্বপ্নই হয়ে থেকেছে তার।

শেষ ম্যাচে নিজের অশ্রু সংবরণ করতে পারেননি ইনজামাম

যতোই আলোচনা-সমালোচনার পাত্র হননা কেন, ইনজামামের মতো এমন জনপ্রিয় এবং প্রাণবন্ত খেলোয়াড় খুব কমই রয়েছে। ক্রিকেট থেকে বেরুনোর পরে কোচিং কিংবা নির্বাচক হলের কল্যাণে এখনও নিজেকে ঢেলে দিয়েছেন ইনজামাম।

শচীন-লারা’দের পাশে এই নামটিও বিশ্বক্রিকেট ইতিহাসে উজ্জ্বল করে। জীবনের পঞ্চাশ বসন্ত পার করা ইনজামাম উল হকের ৫১’তম জন্মদিন আজ।

শুভ জন্মদিন ‘মুলতানের সুলতান’

/নুর ই আলম সিদ্দিকী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *