যেসব কারণে বাংলাদেশের এই অধঃপতন!

ফিচার বাংলাদেশ ক্রিকেট

বিশ্ব ক্রিকেটে আফগানিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশের প্রত্যাবর্তন ঘটেছে অনেক আগে। শুধু টি-টোয়েন্টির হিসাবে গেলেও দেখা যায়, আফগানিস্তান যেখানে তাদের ইতিহাসের প্রথম আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছে ১ ফেব্রুয়ারি ২০১০ তারিখে, সেখানে টাইগাররা ফর্ম্যাটটির জন্মের অল্প কিছুদিনের মাঝেই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ আয়োজন করে ফেলেছিল। খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামে ২০০৬ সালের ২৮ নভেম্বর আয়োজিত সেই ম্যাচে প্রতিপক্ষকে ৪৩ রানের ব্যবধানে পরাজিত করে নিজেদের অভিষেককে আরো বর্ণিল করে তুলেছিলেন মাশরাফি-সাকিবরা। কিন্তু এরপর থেকেই হঠাৎ সবকিছু কেমন যেন বদলে যেতে থাকে। পরিস্থিতি এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে, সেই পুঁচকে আফগানিস্তানই আজ টি-টোয়েন্টি র‍্যাংকিংয়ে টাইগারদের থেকে তিন ধাপ এগিয়ে! এমনকি বছর তিনেক আগে দেরাদুনে বলে-কয়ে টাইগারদের এই ফর্ম্যাটে হোয়াইটওয়াশও করে ছেড়েছে তারা। ফলস্বরূপ ইদানিং বিশ্বখ্যাত ফ্যাঞ্জাইজি লিগগুলোয় সাকিব-মোস্তাফিজদের তুলনায় আফগানদের কদর বেড়েছে। যার ভয়াবহ রূপটা ধরা পড়েছে আইপিএলের ২০১৯ আসরে। যখন সাকিবকে বেশিরভাগ ম্যাচে সাইড বেঞ্চে বসিয়ে আফগান অলরাউন্ডার মোহাম্মদ নবিকে নিয়ে একাদশ সাজিয়েছিল সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ। অথচ মুদ্রার অপর পিঠেই রশিদ-মুজিব-নবিদের নিয়ে রীতিমতো কাড়াকাড়ি জুড়ে দেয় দলগুলো। কিন্তু ঠিক কোন কারণে টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের আজকের এই অধঃপতন? চলুন তাহলে একনজরে এর কিছু সম্ভাব্য উত্তর দেখে আসি।

ক্রিকেটারদের বাজে মন-মানসিকতা

আমাদের দেশে গুরুজনদের প্রায়শই বলতে শোনা যায়, ‘ফাঁকিবাজের তিন হাত – ডান হাত, বাঁ হাত আর অজুহাত।’ বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ঠিক এই কথাটিই প্রযোজ্য। অতীতে আমরা বহুবার দেখেছি, ক্রিকেটাররা যখনই ডান হাত আর বাঁ হাত দিয়ে (ব্যাটে-বলে) আশানুরূপ ফলাফল অর্জন করতে পারেননি, তখনই তারা এর পিছনে কোনো না কোনো অজুহাত দাঁড়া করিয়ে পার পেয়ে যেতে চেয়েছেন। যদিও কদিন আগে নিউজিল্যান্ডের ঐ বিভীষিকাময় সিরিজে ওয়ানডে অধিনায়ক তামিম ইকবাল সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, এবার আর পুরোনো অজুহাত দেওয়া চলবে না, কিন্তু তারপরও তো দেশের মাটিতে পা রেখে তরুণ স্পিনার নাসুম আহমেদ পরিষ্কার আকাশকে নিজেদের ব্যর্থতার জন্য দায়ী করেছিলেন! আজকাল সাধারণ দর্শকরাও তাই বাংলাদেশের অ্যাওয়ে সিরিজগুলোকে একেকটি ‘শিক্ষাসফর’ বলে আখ্যা দিয়ে রসিকতা করছেন। তবে এখানে শুধু ক্রিকেটাদের দায়ী করলেই চলবে না। তাদের অভিভাবকদেরও এখানে দোষ আছে। এই যেমন টাইগার কোচ নাজমুল আবেদীন ফাহিম ইএসপিএন ক্রিকইনফোকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে সেদিন বলছিলেন, ‘আমরা ওখানে ভালো একটি প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলেছি এবং সেটাও আমাদের প্রতিকূল কন্ডিশনে। ওখানে দল হারতেই পারে, তবে যে মানসিকতা নিয়ে ক্রিকেটাররা খেলেছে সেটা ঠিক না। আমরা মাঠের নামার আগেই হার মেনে নিয়েছি। যেহেতু সবকিছু আমাদের প্রতিকূলে তাই হারাটাই স্বাভাবিক। ক্রিকেটারদের মানসিকতাই এমন ছিল। অথচ যেহেতু এই সিরিজে কেউ তেমন কোনো আশা করেননি, তাই ক্রিকেটাররা স্বাধীনভাবে নিজেদের খেলাটা খেলতে পারতেন।’

তিনি আরো যোগ করেন, ‘আমাদের ঠিক সাহসী, পজিটিভ ক্রিকেট খেলার কালচারই নেই এখানে। ক্রিকেটাররা ধারাবাহিক ক্রিকেট খেলায় বেশি মনোযোগ দেন ফলে টি-টোয়েন্টিটা আর খেলা হয় না। তাছাড়া আমাদের শারীরিক গঠনও টি-টোয়েন্টির জন্য উপযুক্ত নয়।’

টাইগারদের এই বাজে মানসিকতার কঠোর সমালোচনা করেছিলেন সাবেক ব্যাটিং কোচ নিল ম্যাকেঞ্জিও। একবার অনুশীলনকালে তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে অনেক প্রতিভাবান ক্রিকেটার আছে। তবে তাদের আরো ধারাবাহিক ও বড় ইনিংস খেলতে হবে। এখানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরের ম্যাচের জন্য দলে জায়গা নিশ্চিত হলেই ক্রিকেটাররা খুশি হয়ে যান। ৪০-৬০ রান করতে পারলেই তারা খুশি। তবে এটা ক্রিকেটের জন্য মোটেও সঠিক নয়। এই মানসিকতা সত্যিই দ্রুত পরিবর্তন হওয়া দরকার।’

বিপিএলে বিদেশি ক্রিকেটারদের প্রাধান্য দেওয়া

ঘরোয়া ক্রিকেটারদের মানোন্নয়ন ও জাতীয় দলের পাইপলাইনকে মজবুত করার লক্ষ্যে ২০১২ সাল থেকে প্রায় প্রত্যেক বছরই বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) আয়োজন করে যাচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। কিন্তু এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টটির সাতটি আসর পার হয়ে গেলেও বাংলাদেশের ক্রিক্রেটকে তেমন কোনো উপহার দিতে পারেনি সেটি। যেখানে আইপিএলের মাধ্যমে প্রতি বছরই ভারতীয় দলে নতুন নতুন সংযোজন আসছে। এর মূল কারণ হচ্ছে বিপিএলে দেশি ক্রিকেটারদের বদলে বিদেশি খেলোয়াড়দের প্রতি দলগুলোর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা। এখানে প্রায় প্রত্যেক ম্যাচেই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে বিদেশিরা বেশি খেলার সুযোগ পাচ্ছেন, যা ঘরোয়া ক্রিকেটারদের প্রতিভা বিকাশে বড়োসড়ো বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যার ফলে আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলোয় সংকটকালীন পরিস্থিতি কি করা প্রয়োজন – তা বাংলাদেশি ক্রিকেটাররা ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না। ব্যাপারটি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা শোনা গিয়েছিল নাজমুল আবেদীন ফাহিমের কণ্ঠেও, ‘এখানে ম্যাচের সংকটকালীন মুহূর্তগুলোতে বাইরের ক্রিকেটারদের উপরই ভরসা রাখা হয়। ফলে লোকাল ক্রিকেটাররা অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সুযোগই পাচ্ছেন না। আসলে লোকাল ক্রিকেটারের উন্নতি করানোর সুযোগ বা চেষ্টা – কোনোটাই ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর থাকে না। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে তিন-চারদিন অনুশীলন করা হয়। বিদেশ থেকে একজন কোচ আসেন এবং তাঁর সাথে সেলফি তুলতে তুলতেই সময় কেটে যায়।’

দক্ষ খেলোয়াড়ের অভাব

[ছবি: ইএসপিএনক্রিকইনফো]

যদিও বিসিবি বরাবরই বলে আসছে, ‘আমাদের পাইপলাইনে ভালো খেলোয়াড়ের কোনো অভাব নেই।’ কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান দলের দিকে তাকালে সেই বক্তব্যের ভুল দিকটি স্পষ্টই ফুটে উঠে। এই যেমন – একের পর এক বাজে পারফরম্যান্সের পরও সৌম্য-মিঠুন-শান্তরা প্রায় নিয়মিত দলে জায়গা পাচ্ছেন। অথচ এমন পারফরম্যান্স নিয়ে অন্য কোনো বড় দলের একাদশ তো দূর, স্কোয়াডেও তারা হয়ত সুযোগ পেতেন না। হ্যাঁ, কালেভদ্রে তারা দুয়েকটি অসাধারণ ইনিংস খেলছেন সত্য, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট সামান্য। এরপর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটাঙ্গনে পা রাখার ৩৫ বছর পার করে ফেললেও এখনো পর্যন্ত কোনো মানসম্পন্ন লেগ স্পিনার কিংবা রিস্ট স্পিনারের জন্ম দিতে পারেনি বাংলাদেশ। যেখানে যুদ্ধ-বিদ্ধস্ত আফগানিস্তানের রশিদ-মুজিব কিংবা জাহির খানরা আজকের ক্রিকেট বিশ্বকে শাসন করে চলেছেন। আবার পঞ্চপান্ডব ছাড়া খুব কম ক্রিকেটারই ধারাবাহিকভাবে দলে অবদান রাখতে পেরেছেন। আর একজন মাশরাফির অভাব তো বাংলাদেশ এখনই হাঁড়ে-হাঁড়ে টের পাচ্ছে। জুনিয়রদের এমন গা ছাড়া ভাবও বাংলাদেশের অবনতির একটি অন্যতম কারণ। কেননা আইপিএলের মতো বিশ্বখ্যাত আসরে যখন এক সাকিব আর মোস্তাফিজ ছাড়া কেউ দল পান না, তখন তা দেশের জন্য লজ্জার কারণই বটে।

আশার প্রদীপ তবু জ্বল জ্বল

মানুষ আশায় বাঁচে। তাই বাংলাদেশের ক্রিকেটের পুরোনো যুগ আবার যে নতুন করে ফিরে আসছে, তেমনটা ভাবাও ঠিক হবে না। কেননা বাংলা প্রবাদেই আছে, ‘ঘুমিয়ে আছে পিতা প্রত্যেক শিশুর অন্তরে।’ তামিম-সাকিবরা একটা সময় যেমন চলে যাবেন সত্য, তেমনইভাবে এটাও স্বাভাবিক যে সৃষ্টিকর্তা চাইলে আরো নতুন প্রজন্মের ছেলেদের মধ্যেও সেরকম প্রতিভাবান ক্রিকেটারদের দেখা মিলবে। এই যেমন ধরুন – তরুণ তুর্কি নাইম শেখের কথা। তামিম ইকবালের মতো তার অভিষেকটাও কিন্তু হয়েছে উদ্ভাবনী শটের ঝুলিকে সঙ্গে নিয়ে। টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারের ৯ ম্যাচে ৩৩.৬৬ গড়ে এখন পর্যন্ত করেছেন ৩০৩ রান। যথেষ্ট আশা জাগানিয়া পারফরম্যান্স যেটি। এর মাঝে ভারতের মাটিতে তাদের সঙ্গে খেলা ৮১ রানের একটি অসাধারণ ইনিংসও কিন্তু আছে। এরপর অনুর্ধ্ব-১৯ দলের বিশ্বজয়ী পেসার শরিফুল ইসলামের কথায় আসি। সবশেষ নিউজিল্যান্ড সফরে ভালোভাবেই খেলতে দেখা গিয়েছিল তাকে। আবার তারই আরেক সতীর্থ শামীম পাটোয়ারির মাঝে দেখা গেছে দুর্দান্ত রকমের পাওয়ার হিটার হয়ে ওঠার সম্ভাবনা। এদিকে বিরাট কোহলিদের মতো করে আকবার আলীও কিন্তু হয়ে উঠতে পারেন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ দলের ‘পালের গোদা।’

তবে এসবের জন্য প্রয়োজন বিসিবির সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা এবং যথাযথ পর্যবেক্ষণ। কারণ দিনশেষে নাইম-শরিফুলদের গড়ে তোলার দায়িত্বটা যে তাদের হাতেই!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *