টেম্পু চালক বাবার প’ঙ্গুত্ব, ভাইয়ের আ’ত্নহ’ত্যা; লড়াই করে অভিষেকেই নায়ক সাকারিয়া

আইপিএল

আইপিএলের হাত ধরে অনেক অখ্যাত ক্রিকেটারের স্বপ্নপূরণ হয়েছে। একেবারে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে অনেকেই মুখ দেখেছেন কোটি টাকার । এবারের চেন্নাই আইপিএলের নিলামও সাক্ষী থাকল সেইরকম এক রূপকথার। নাম চেতন সাকারিয়া। গুজরাতের এক তরুণ ক্রিকেটার তিনি। বাঁ-হাতি এই পেসার নজর কাড়েন ঘরোয়া ক্রিকেটে। সৈয়দ মুস্তাক আলিতে অসাধারণ পারফরম্যান্স করেন তিনি।


ভারতের গুজরাটের এক তরুণ ক্রিকেটার চেতন সাকারিয়া। বাবা পেশায় একজন টেম্পোচালক। শুরু থেকেই দারিদ্রতার সঙ্গে তাদের বসবাস। দিন আনে দিন খেয়ে চলতো তারা, কখনো বা থাকতেন না খেয়ে। তিনটি দুর্ঘ”টনার পরে তিনি এখন পুরোপুরি শয্যাশায়ী এবং উপার্জন করতে পারছেন না। তবে চরম এই দারিদ্র্যতাকে পেছনে ফেলে অবশেষে পরিবারের স্বপ্ন পূরণ করে ফেললেন সাকারিয়া। আইপিএলে নিলামে বনে গেলেন কোটিপতি।

গুজরাটের ভাবনগর জেলা থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে ভারতেজ গ্রামে চেতন সাকারিয়ার জন্ম। ছোট বেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন ক্রিকেটার হওয়ার। দারিদ্রতার কারণে সেটা খুব একটা সহজ ছিল না তার। তবে এই দারিদ্রতা থামাতে পারেনি অদম্য চেতনকে। নিজের জেদ এবং কঠোর পরিশ্রমের ফলেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় টি-টোয়েন্টি লিগ ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে জায়গা করে নিয়েছেন। গত আসরে আরসিবির নেট বোলার হওয়ার সময়ই নজরে আসেন চেতেন। এবারের আইপিএল নিলামে রাজস্থান রয়্যালস ১ কোটি ২০ লাখ রুপিতে দলে নিয়েছে চেতনকে।

পরিবারে অত্যন্ত দারিদ্রতার কারণে চেতনের বাবা প্রথম থেকেই চাইতেন ছেলে যেন পড়াশোনা করে সরকারি চাকরি করে পরিবারের হাল ধরুক। তিনি কখনোই চাননি ছেলে ক্রিকেটার হোক। যেকারণে পরিবার সচল না হওয়ায় ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নে ধুলো জমতে শুরু করে চেতনের। তবে তখন হঠাৎই ত্রাতা হয়ে এসে সাকারিয়াকে ক্রিকেটার বানানোর দায়িত্ব নেন তাঁর এক কাকা। কিন্তু সেখানে অন্যরকম এক শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর স্টেশনারির দোকানে তাঁকে সাহায্য করলেই কেবল পড়াশোনা ও ক্রিকেটের খরচ বহন করার কথা দিয়েছিলেন তাঁর সেই কাকা।

ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নে বুদ থাকা ২৩ বছর বয়সি এই পেসার সেই শর্তে রাজি হয়ে যান। তাতে প্রায় ২ বছর তাঁকে সেই দোকানে কাজ করতে হয়েছিল। তখনও কোনও ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হননি সাকারিয়া। পাড়াতে আর স্কুল ক্রিকেট খেলতেন তিনি। জেলাস্তরের স্কুল ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় এক ক্রিকেট অ্যাকাডেমির কোচের নজরে পড়ে যান তিনি।

এরপর ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হয়ে অনুশীলন শুরু করেন তিনি। সেখানে ভালো করার সুবাদে খুব তাড়াতাড়ি সৌরাষ্ট্রের হয়ে অনূর্ধ্ব ১৬ দলে সুযোও পেয়ে যান। পরে সৌরাষ্ট্রের অনূর্ধ্ব ১৯ দলেও সুযোগ পান। কিন্তু যুব দলের হয়ে খেলার জন্য স্পাইকওয়ালা জুতা ছিল না তাঁর কাছে।

সাকারিয়াকে সৌরাষ্ট্রের নেটে প্রথম বোলিংয়ের জুতো উপহার দেন কলকাতা নাইট রাইডার্সের (কেকেআর) তারকা শেলডন জ্যাকসন। যে খেলোয়াড়কে ২০ লাখ রুপিতে দলে নিয়েছে কেকেআর। তবে জ্যাকসন এক শর্তে দিয়েছিলেন সেই জুতো। যদি তাকে আউট করতে পারেন তবেই উপহার দেবেন। আর সেই শর্ত পুরন করে জুতো অর্জন করে নেন চেতন।

এ প্রসঙ্গে সাকারিয়া বলেন, ‘এটি (বোলার হওয়ায়) আমাকে সাহায্য করেছিল যে আমি একজন বোলার ছিলাম, ব্যয়ও কম ছিল। আমি বয়সভিত্তিক ক্রিকেট খেলার আগ পর্যন্ত আমার কাছে স্পাইকওয়ালা জুতা কেনার পয়সা ছিল না। তাই আমার সিনিয়ররা আমাকে এটিতে সহায়তা করতেন যেহেতু আমি কম করে ব্যাট করতাম, তাই আমি একজনের কাছে ব্যাট ধার করতাম। এটি ছিল শেল্ডন জ্যাকসনের।’

চেতন সাকারিয়া আইপিএল নিয়ামে রাতারাতি কোটিপতি হয়ে গিয়েছেন তাও তিনি দুঃখের মধ্যে রয়েছেন। আসলে গত জানুয়ারি তিনি নিজের ছোটভাইকে হারিয়েছেন। গণমাধ্যমকে সাকারিয়া জানিয়েছিলেন যে আইপিএল নিলামে ১ কোটি ২০ লাখ রুপি অপ্রত্যাশিত বিড তার জীবন বদলে দেবে, কিন্তু তিনি তার ছোটভাইকে হারানোর পর এখনও একাকীত্ব অনুভব করছেন।

এ প্রসঙ্গে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে তিনি বলেন, ‘আমার ছোটভাই জানুয়ারি মাসে সু’ইসা’ইড করেছে, আমি বাড়িতে ছিলাম না, আমি সেই সময় সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফি খেলছিলাম। বাড়ি ফেরা পর্যন্ত আমি জানতামই না যে ও আর নেই। তখনও আমার পরিবার আমাকে এক খবর দেয়নি। আমি ওদের কাছে রাহুলের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করতাম, আর ওরা আমাকে বলত যে ‘ও বাইরে গিয়েছে’, ওর অনুপস্থিতি আমার জন্য ভীষণ একাকীত্বের। যদি ও আজ এখানে থাকতো তো আমার চেয়ে বেশি খুশি হতো।’

জস বাটলার, বেন স্টোকস ও কাটার মাস্টার মুস্তাফিজের সাথে একই দলে আইপিএলের প্রথম ম্যাচেই অভিষেক হয়েছে এই তরুণের। নিজের অভিষেক ম্যাচেও অনেকটা সবার থেকে ব্যতিক্রম ছিলেন চেতন। সাকারিয়া তার চার ওভারে ৩১ রান নিয়েছিলেন এবং তিনটি উইকেট নিয়েছিলেন। এ ছাড়া নিকোলাস পুরাণের এমন দুর্দান্ত ক্যাচটি ধরেন তিনি, যা চোখের উপর বিশ্বাস করা মুশকিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *