টিভি চ্যানেলের লোভে ক্রিকেটের মৃত্যুর গল্প

ক্রিকেট ফিচার

ঘটনাটা ঠিক ১৯৯২ সালের। বিশ্বকাপের পর্দা ওঠার দিন ক্রমেই ঘনিয়ে আসছে। দক্ষিণ আফ্রিকান কিংবদন্তি নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা আইসিসিকে অনুরোধ করলেন যাতে তার দেশের ক্রিকেট দলের ওপর আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা তুলে কেপলার ওয়েলস-ঝন্টি রোডসদের সেখানে খেলার সুযোগ করে দেওয়া হয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় তখনো মেন্ডেলার দল আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের নেতৃত্বে বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন চলছিলো। তাই আইসিসি দীর্ঘ ২১ বছর পর প্রোটিয়াদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটাঙ্গনে নামার সুযোগ করে দিলেও এক্ষেত্রে তাদের ওপর দুইটি শর্তারোপ করে। প্রথমটি হলো দেশটিতে বিদ্যমান ঘৃণ্য বর্ণবাদ প্রথা তুলে নিতে হবে যে কারণে প্রায় দুই দশক আগে তাদের ক্রিকেট থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিলো এবং অপর শর্তটি ছিলো দক্ষিণ আফ্রিকাকে অবশ্যই টুর্নামেন্টটিতে ভালো কিছু করে দেখাতে হবে। অবশ্য বিশ্বকাপ শুরু হবার আগ মুহূর্তে প্রথম শর্তের ব্যাপারে কিছুটা কোমল হয় আইসিসি। কারণ তখনকার দিনে বর্ণবাদ প্রথাটি বিলুপ্ত হওয়া, না হওয়াটা পুরোপুরি নির্ভর করছিলো ২.৮ মিলিয়ন শ্বেতাঙ্গ আফ্রিকানদের এক গণভোটের ওপর। তাই ভোটের রায় যদি মানবতার পক্ষে না যেত, তাহলে হয়তো বিশ্বকাপের মাঝপথেই চিরদিনের জন্য ক্রিকেটকে বিদায় জানাতে হতো প্রোটিয়াবাহিনীকে। এভাবে বিশাল অনিশ্চয়তাকে মাথায় নিয়েই ওশেনিয়া মহাদেশের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান কেপলার ওয়েলস-ঝন্টি রোডসরা।

অন্যদিকে টুর্নামেন্টের প্রথম থেকেই দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেটাররা এই ভেবে খেলতে নামতেন যে, ‘এটাই হয়তো আমার ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ। তাই যা করার আজই করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে মনের মধ্যে কোনো আক্ষেপ লুকানো না থাকে।’ তবে সৃষ্টিকর্তার পরিকল্পনাটা এক্ষেত্রে একটু অন্যরকমেরই ছিলো। টুর্নামেন্টে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটের বড় ব্যবধানে হারিয়ে দেয় প্রোটিয়ারা। এরপর নেলসন ম্যান্ডেলার রংধনুর দেশের কাছে একে একে হারতে থাকে ভারত, পাকিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং জিম্বাবুয়ের মতো প্রতিষ্ঠিত দলগুলো। ফলশ্রুতিতে কিছুটা সহজেই রাউন্ড রবিন পদ্ধতিতে আয়োজিত গ্রুপ পর্ব টপকে সেমিফাইনালে পৌঁছে যান ঝন্টি রোডসরা। এদিকে সেমিফাইনালের ঠিক আগ মুহূর্তে বর্ণবাদবিরোধী সেই ঐতিহাসিক গণভোট আয়োজিত হয়। যেখানে ৬২.৭৮% লোকের হ্যাঁ সূচক ভোটে দীর্ঘ বর্ণবিদ্বেষের ইতিরেখা টানার মধ্যদিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার পুনর্জন্ম হয়। অন্যদিকে সুদূর অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করা ক্রিকেটারদের সামনে তখন নতুন সুযোগ – বিশ্বজয় করে দেশের এই নতুন অধ্যায়কে আরো বর্ণিলভাবে সাজানোর। কিন্তু সেই সেমিফাইনালের দিন এমন এক ঘটনা ঘটে যায় যা ক্রিকেট বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দেয়।

সেই ঘটনাকে আরো স্পষ্টভাবে বোঝার জন্য চলুন আরেকটি ছোট্ট গল্প শুনে (পড়ে!) আসি। যেহেতু সেসময় ক্রিকেটের আধুনিকায়ন করার জন্য অনেক কিছুকে ঢেলে সাজানো হচ্ছিলো, তাই আইসিসির তৎকালীন কিছু নিয়মের মাঝে সীমাবদ্ধতাও লক্ষ্য করা যেত। এরমধ্যে অন্যতম একটি ছিলো বৃষ্টি আইনের ব্যাপারটি। এই আইন অনুসারে কোনো ম্যাচ যদি বৃষ্টি দ্বারা বিঘ্নিত হতো তাহলে প্রথম ব্যাটিং করতে থাকা দল যেসব ওভারে কম রান করতো, সেগুলোকে বাদ দিয়ে দেওয়া হতো। যেমন ধরুন, কোনো দল ৫০ ওভার ব্যাটিং করে ২৭০ রান স্কোরবোর্ডে তুললো। এখন এই ৫০ ওভারের মাঝে আবার ১০ ওভারে তারা কোনো রান তুলতে পারেনি অর্থাৎ মেডেন দিয়েছে। কিন্তু বৃষ্টি শেষে দ্বিতীয় দল যখন টার্গেট তাড়া করতে নামবে, তখন তাদের জন্য সেই ১০ ওভারকে বাদ দিয়ে ৪০ ওভারের সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। অন্যদিকে টার্গেট সেই ২৭১-ই থাকবে, সেখানে কোনো পরিবর্তন আসবে না। যে কারণে পরে ব্যাটিং পাওয়া দলগুলো বারবার এই নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে দুর্ভোগ পোহাচ্ছিলো এবং সেক্ষেত্রে তাদের বলার মতো কিছুও ছিলো না। এরই মধ্যে আরো একটি বিপদের ঘণ্টা হাতে নিয়ে আবির্ভূত হয় ম্যাচ সম্প্রচারকারী টিভি চ্যানেলগুলো। বিভিন্ন কারণে তখনকার টিভি চ্যানেলগুলো ছিলো প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী। একটি ম্যাচ কতক্ষণ ব্যাপী চলবে আর একটি ইনিংসে কত ওভার খেলা হবে – ১৯৯২ বিশ্বকাপে তার পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করতো অস্ট্রেলিয়ান টিভি চ্যানেলগুলো। এর কারণটাও ছিলো বেশ অনুমেয়। অস্ট্রেলিয়া তখনকার দিনে অন্যতম সেরা ‘কমার্শিয়াল’ আয়োজক ছিল এবং সবকিছুতে আর্থিক লাভ খোঁজাটা তাদের একরকম বদ অভ্যাসে পরিণত হয়েছিলো। তাই টিভি চ্যানেলগুলো একদিকে যেমন ম্যাচের সময়সীমা নিজেদের মতো করে নির্ধারণ করতো, তেমনি আয়োজকরাও অতিরিক্ত অর্থ গোণার ভয়ে সময়সীমা বাড়ানোর কোনো উদ্যোগই নিতো না। আর তাদের এই হাঁড়কিপ্টামির চড়া মাশুল দিতে হয়েছিলো ক্রিকেট বিশ্বকাপের মতো একটি বৈশ্বিক টুর্নামেন্টকে।

এবার চলুন মূল ঘটনায় ফিরে আসি। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি ছিলো ২২ মার্চ, ১৯৯২। শক্তিশালী ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালের ময়দানে মুখোমুখি ২১ বছরের লম্বা নির্বাসন কাটিয়ে ফেরা দক্ষিণ আফ্রিকা। আকাশে সেদিন মেঘ ছিলো, ছিলো বৃষ্টির আশংকাও। এমন সময় টসে জিতে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত জানান প্রোটিয়াবাহিনী প্রধান কেপলার ওয়েলস। এতে ধারাভাষ্যকার, দর্শক এমনকি ইংলিশ ক্যাপ্টেন গ্রাহাম গুচের চোখেমুখে তখন অবিশ্বাসের ছাপ। কারণ বিরক্তিকর সেই বৃষ্টি আইনের কারণে মেঘলা দিনে যেকোনো দলই তখন আগে ব্যাটিং করতে চাইতো। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা সেদিন হাঁটলো সম্পূর্ণ উল্টো পথে। ধারাভাষ্যকার তাই বিস্ময়ের সঙ্গে প্রোটিয়াদের দলপতিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘ক্যাপলার, বৃষ্টি নিয়ে কি আপনি অতোটা চিন্তিত নন?’ উত্তরে ক্যাপলার বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, এটা একটি ক্যালকুলেটেড রিস্ক বটে। তবে আমাদের বোলিংয়ের সময় বৃষ্টি নামলে আমার মনে হয় তেমন অসুবিধা হবে না। সমস্যাটা তখনি হবে যখন আমরা ব্যাটিং করছি আর এমন সময় বৃষ্টি নামলো। অবশ্য আমরা সেই ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত আছি আর আপাতত নিজেদের পরিকল্পনামাফিক খেলতে চাই।’ কিন্তু কে জানতো এই ‘ক্যালকুলেটেড রিস্ক’ ফ্যাক্টরটি দিনশেষে এমন সমীকরণ তৈরি করবে যে প্রায় নিশ্চিত জেতা ম্যাচও তাদের হেরে বসতে হবে।


যা হোক অবশেষে খেলা শুরু হলো। দক্ষিণ আফ্রিকান বোলারদের দাপটে পুরো ইনিংস জুড়েই কিছুটা চাপে ছিলেন ইংলিশ ব্যাটসম্যানরা। টেলিভিশন চ্যানেলের বরাদ্দকৃত সময়ের মধ্যে তারা মাত্র ৪৫ ওভার ব্যাটিং করার সুযোগ পেয়েছিলেন এবং ফলশ্রুতিতে প্রোটিয়াদের জন্য টার্গেট দাঁড়ায় ৪৫ ওভারে ২৫৩ রান। তবে ইংলিশ বোলাররাও ছেড়ে কথা বলেননি। তাদের আগুন ঝরা বোলিংয়ে ২৭ ওভারে ১৩১ রান তুলতে না তুলতেই ৪ উইকেট হারিয়ে বসেন কেপলার-রোডসরা। অবশ্য এমন সময় ঝন্টি রোডসের ৩১ বলে খেলা ৪৭ রানের অসাধারণ ইনিংসের সুবাদে সেই ইনিংসে পুনরায় প্রাণ ফিরে পায় দক্ষিণ আফ্রিকা। দলীয় ২০৬ রানের মাথায় তার বিদায়ের পর ব্রায়ান ম্যাকমিলান এবং ডেভ রিচার্ডসনের ঝড়ো ইনিংসে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যেতে থাকে রানের চাকা। প্রোটিয়াদের স্কোরবোর্ডে তখন সংগ্রহ হয়েছে ২৩১ রান। কিন্তু হঠাৎ আকাশ ভেঙে নেমে আসা বৃষ্টিধারা সবকিছু ভেস্তে দেয়। ম্যাকমিলান এবং রিচার্ডসনের মাথায় তখন হয়তো ঘুরছিলো, ‘ইশশ, আরেকটু সময় যদি খেলাটা চালিয়ে আসতে পারতাম।’ বৃষ্টি ততক্ষণে বেশ ভালোভাবেই নেমেছে। যেহেতু সেমিফাইনালের জন্য রিজার্ভড ডে রাখা ছিলো, তাই আয়োজকরা চাচ্ছিলেন পরেরদিন ম্যাচের ফলাফল নির্ধারণ করতে। কিন্তু এক্ষেত্রে বাঁধ সাধলো ঐ টিভি চ্যানেল। তাদের কথা, যা করার আজই করো। কালকের জন্য এই ম্যাচ ফেলে রাখা চলবে না।‘ একইসঙ্গে তারা আরেকটি শর্তও জুড়ে দিলো – খেলা কিন্তু ১০টা ১০ এর মধ্যেই শেষ করতে হবে। অগত্যা আয়োজকদের এই অন্যায় আবদার মানতে হলো। এরপর বৃষ্টি থামলে দক্ষিণ আফ্রিকাকে জানানো হলো, তাদেরকে বৃষ্টি আইনে ২৫ বলের বদলে এখন ১৩ বলে ২২ রান তাড়া করে জিততে হবে। হতভাগা ম্যাকমিলান এবং রিচার্ডসন যখন গ্লাভস পরে ক্রিজের দিকে যাচ্ছিলেন, তখন নির্ধারিত সময়সীমা মানার জন্য সেই ১৩ বলও কমে নেমে আসে মাত্র ১ বলে। অন্যদিকে টার্গেট যথারীতি সেই ২২ রানই রয়ে গেছে। এমন অবিশ্বাস্য সিদ্ধান্তে দক্ষিণ আফ্রিকান টিম ম্যানেজমেন্ট তো বটেই, এমনকি ইংলিশ খেলোয়াড়রাও প্রতিবাদ করে বসেন। কিন্তু কিছুই করার ছিলো না। ঘটনার আকস্মিকতায় ভেঙে পড়া ম্যাকমিলানকেই শেষ বলটি খেলতে হলো। অন্যদিকে ১৯ রানের জয় নিয়ে ইংলিশরা চলে গেলো ফাইনালে। স্টেডিয়ামের জায়ান্ট স্ক্রিনে তখন সময়টা ১০টা ৮ মিনিট। আর এই পুরো ঘটনাটা ঘটলো শুধু একটি টিভি চ্যানেলকে বাণিজ্যিক সুবিধা প্রদান করতে গিয়ে। ক্রিকেটের সত্যি বলতে সেদিন একরকম অপমৃত্যুই ঘটে গিয়েছিলো। দক্ষিণ আফ্রিকান খেলোয়াড়রা অবশ্য এরপরও দর্শকদের প্রতি সম্মান জানাতে পুরো মাঠ প্রদক্ষিণ করেছিলো। কিন্তু তাদের মনে কি সেই শান্তিটুকু ছিলো?

অবশ্য বৃষ্টি আইন নিয়ে এরপর বিস্তর গবেষণা হয় এবং ১৯৯৮ সাল থেকে আজ পর্যন্ত এরকম পরিস্থিতে যে নিয়মটি অনুসরণ করা হচ্ছে তার নাম ডার্কওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতি। আর ইংলিশরা ভাগ্যের জোরে সেবার ফাইনালে চলে গেলেও শেষ পর্যন্ত তাদের আর ট্রফিটি ছুঁয়ে দেখা হয়নি। ২২ রানের ব্যবধানে ম্যাচটি জিতে প্রথমবারের মতো বিশ্বজয় করে ইমরান খানের পাকিস্তান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *