ভাঙ্গা হাত ও একজন দেশপ্রেমিক তামিমের গল্প

ফিচার

সামনেই টি-২০ বিশ্বকাপ। অন্যান্য দলগুলোর মতো দল গোছাতে শুরু করেছে বাংলাদেশও। ইতিমধ্যেই ঘোষণা হয়েছে স্কোয়াড। কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য সবচাইতে অবাক করা বিষয় হলো, বিশ্বকাপে খেলছেন না তামিম। অবশ্য তাকে স্কোয়াডে রাখার চিন্তা করেছিলেন নির্বাচকরা। কিন্তু নানা আলোচনা-সমালোচনার ভীড়ে নিজেই দল থেকে সরে গিয়েছেন তিনি। অবশ্য অনেকাংশেই মনে করা হচ্ছে এটা তার অভিমান। অভিমানের বশবর্তী হয়েই তিনি এমনটা করেছেন, নইলে হয়তো নেপালী লীগে খেলতে যেতেন না। আসল ব্যাপারটা যে কি, সেটা হয়তো তামিম-ই ভালো জানেন। তবে তামিমের দলে না থাকায় এক শ্রেণীর নিন্দুকের চোখেমুখে খুশির অন্ত নেই। অথচ এই তামিম-ই কিনা দেশের জন্য করেছেন বহু আত্মত্যাগ। তেমনই এক আত্মত্যাগের গল্প করা যাক আজ।


গল্পটা আজ থেকে ঠিক তিন বছর আগেকার। ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮; ম্যাচের শুরুতেই কব্জিতে আঘাত। পরে হাসপাতালে করা হলো স্ক্যান। যেখানে দেখা গেল হাতের কব্জিতে চিড় ধরা পড়েছে। জানা গেছে এশিয়া কাপেই আর খেলতে পারবেন না তিনি। পরে টিভিতেও দেখা গেল হাতে ব্যান্ডেজ এবং গলায় সেই হাত ঝুলিয়ে রেখেছেন তিনি।

এমন পরিস্থিতিতে তামিমের মাঠে নামার কথা চিন্তা করাটাই যেন বোকামি। কিন্তু দেশপ্রেম কাকে বলে, তার চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করলেন তামিম ইকবাল। একে একে যখন একপাশে উইকেটের পর উইকেট পড়ছে, তখন অন্য পাশে অপরাজিত থেকে যান সেঞ্চুরি করা মুশফিকুর রহীম।

এ পরিস্থিতিতে ম্যাচের ৪৭তম ওভারের ৫ম বলে আউট হয়ে যান মোস্তাফিজুর রহমান। বল তখনও বাকি ১৯টি। দলীয় রান ২২৯। এ পরিস্থিতিতে অপরাজিত থাকা তামিম ইকবাল মাঠে নামলে মুশফিকের সঙ্গে জুটি বাঁধতে পারেন।

কিন্তু তামিম তো আহত। ভাঙা হাত নিয়ে কীভাবে মাঠে নামবেন তিনি? কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে মাঠে নামলেন তামিম। ভাঙা হাত। কব্জিতে ব্যান্ডেজ বাঁধা। এমন পরিস্থিতিতে সুরাঙ্গা লাকমালকে এক হাত দিয়ে মোকাবেলা করেন তামিম।

এরপর বাকি তিন ওভারে স্ট্রাইকে থাকেন মুশফিক। অন্য প্রান্তে তামিম শুধু তাকে সঙ্গ দেন। মুশফিক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ব্যাট করে যান। ৪৮তম ওভারে থিসারা পেরেরার কাছ থেকে মুশফিক নেন ১৫ রান। ৪৯তম ওভারে দাসুন সানাকাকেও একটি বাউন্ডারি মারেন তিনি। শেষ অব্দি ম্যাচটা জিতেও যায় বাংলাদেশ। আর তামিম হয়ে যায় নায়ক। কিন্তু সেই গৌরব হয়তো বেশিদিন মনে রাখা হয়নি আমাদের।

ঠিক এরকমই ঝুঁকি নিয়ে খেলতে নামা তামিম যে লোক দেখানো কিংবা নিজের নাম কামানোর জন্য এমনটা করেননি সেটা নিন্দুকেরাও প্রমাণ করতে পারবেন না। অথচ সেই তামিম-কে ই কিনা স্বার্থপর আখ্যা দেয়া হয়। ইগো বেশি, তাই সে নিজের জায়গা ছাড়তে চায়না সহ আরও কতো অপবাদ। আসলেই কি তেমনটা। যদি তেমনটাই হতো, তাহলে নিশ্চয়ই বিশ্বকাপ থেকে সরে যেতেন না তামিম। তিনি খেললে পুচকে নিন্দুকদের বলারও কিছুই থাকতোনা। কিন্তু না, অপমানের কালিমা গায়ে মাখাতে দেননি তামিম, সরে গিয়েছেন বীরের মত।

যে এক হাতের লড়াই দেখেছে গোটা ক্রিকেটবিশ্ব, সে লড়াই বঙ্গোপসাগরে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের চাইতেও সুগভীর, তাজিওডং পাহাড়ের চাইতেও দৃঢ়। অকুতোভয় এই নির্ভীক যোদ্ধাকে আমরা মূল্য দিই বা না দিই তিনি কিন্তু ঠিকই মূল্য দিয়েছেন দলের সম্মান রক্ষার।

/নূর ই আলম সিদ্দিকী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *