বিদায়! শুধুমাত্র আম্পায়ারিং করে বিশ্ব জয় করা ‘বিলি বাউডেন’

ফিচার

পুরো নাম ব্রেন্ট ফ্রেজার বিলি বাউডেন। ১৯৬৪ সালের আজকের এই দিনে (১১ এপ্রিল) নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ক্রিকেটের বিখ্যাত এই আম্পায়ার। অথচ তার গল্পটা অন্যরকমও হতে পারতো। যদি কিনা আরথ্রাইটিস নামক গাঁট-ফোলানো রোগটা শরীরে বাসা না বাধতো। স্টিভেন ফ্লেমিং, শেন বন্ড, ডেনিয়েল ভেট্টোরির সাথে হয়তো তার নামও উচ্চারিত হতো ক্রিকেটার হিসেবে।

স্যার রিচার্ড হ্যাডলি, মার্টিন ক্রোর দেশে জন্ম নেওয়া বিলি বাউডেন ছোট বেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন ক্রিকেটার হওয়ার। সেই পথে অনেকটা এগিয়েও গিয়েছিলেন। ফাস্ট বোলার হিসেবে নিজের প্রতিভার ছাপ রাখতে শুরু করেছিলেন কেবল, ঠিক তখনই ধরা তার শরীরে বাসা বাধে আরথ্রাইটিস রোগ। ব্যাট-প্যাড তুলে রাখলেও ক্রিকেট থেকে দূরে সরে যাননি।

সবুজ গোলাকৃতির মাঠ আর ২২ গজের উইকেটের প্রতি রোমাঞ্চ, ভালোবাসার কোনো কমতি ছিলো না বিলির। তাই তো ক্রিকেটকে ভালোবেসে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন আম্পায়ারিং। নিউজিল্যান্ড হেরাল্ড পত্রিকার এক বিজ্ঞাপন তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তারপর কেবলই এগিয়ে যাওয়ার গল্প।

১৯৯৫ সালে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ খেলতে নিউজিল্যান্ড গিয়েছিলো শ্রীলঙ্কা। তিন ম্যাচ সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে আম্পায়ারিংয়ের দায়িত্ব পড়ে বিলি বাউডেন ও ক্রিস্টোফার কিংয়ের উপর। সেই ম্যাচে দিয়েই আম্পায়ার হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শুরু হয়েছিলো বিলি বাউডেনের। এরপর ক্রিকেট ইতিহাসের দ্বিতীয় আম্পায়ার হিসেবে পরিচালনা করেছেন ২০০টি ওয়ানডে ম্যাচ। ২০৯টি ওয়ানডে ম্যাচে আম্পায়ারিং করে বিলির চেয়ে এগিয়ে আছেন কেবল দক্ষিণ আফ্রিকান রুডি কোয়ের্টজেন।  

মাঠে বিলি বাউডেন থাকা মানেই বাড়তি বিনোদন। তার ক্রুকড ফিঙ্গার অফ ডুমের জন্য তিনি বিখ্যাত। ব্যাটসম্যান আউট হওয়ার পর আঙ্গুল সোজা করে কপিবুক স্টাইলে আউটের সিগনাল দিতে পারতেন না আরথ্রাইটিসের কারণে সৃষ্ট শারীরিক সমস্যার কারণে। তাই বলে তিনি থেমে থাকেন নি। সেখানে দিয়েছেন নতুন এক মাত্রা! তার ট্রেডমার্ক ক্রুকড ফিঙ্গার অফ ডুম সেই কথাই বলে।

ব্যাটসম্যান চার মারার পর দুই হাত ব্যবহার করে ক্রাম্ভ সুইপিং স্টাইলে বাউন্ডারির সিগনাল দেয়া, কিংবা ডাবল ক্রুকড ফিঙার সিক্স ফেজ হপ স্টাইলে ছয়ের সিগনাল দেওয়ার জন্য হলেও ক্রিকেট ইতিহাস অনেকদিন মনে রাখবে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) এলিট প্যানেলের এই আম্পায়ারকে।

২০০০ সালে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যকার ট্রান্স-তাসমান ট্রফির প্রথম টেস্ট সামলাতে মাথায় হ্যাট চাপিয়ে শ্রীলঙ্কার বিখ্যাত আম্পায়ার শ্রীনিবাস ভেঙ্কটারাঘবনের সাথে মাঠে নেমেছিলেন বিলি। এরপর আরও ৮৪টি টেস্ট ম্যাচে আম্পায়ার হিসেবে দেখা গেছে তাকে।

বিলি বাউডেনকে ঘিরে মজার ঘটনা আছে বেশ কয়েকটা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচ। ময়দানি লড়াইয়ে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড। বলা চলে অনেকটা পিকনিক মুডের ম্যাচ ছিল। দুই দলের ক্রিকেটাররাই তাদের সাবেক ক্রিকেটারদের জাদরেল গোঁফ ও লম্বা চুলের আদলে নকল গোঁফ ও পরচুলা লাগিয়ে খেলতে নেমেছিলেন। ম্যাচের শেষ দিকে অস্ট্রেলিয়ার জয় নিশ্চিত শতভাগ। ঠিক তখন অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তি বোলার গ্লেন ম্যাকগ্রা মজা করে আন্ডার আর্ম বল করার চেষ্টা করেছিলেন।

সেই ম্যাচে অন-ফিল্ড আম্পায়ারের দায়িত্বে ছিলেন বিলি বাউডেন। বিলিও কম যাননি! সাথে সাথে ম্যাকগ্রাকে লাল কার্ড দেখিয়েছিলেন। এরপর ২০১৪ সালে এশিয়া কাপে বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানের মধ্যকার ম্যাচে আফগান উইকেটরক্ষক মোহাম্মদ শাহজাদকে অতিরিক্ত আবেদন করার জন্য লাল কার্ড দেখিয়েছিলেন এই বিলি বাউডেন। এরপর ২৪টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচের দায়িত্ব সামলেছেন।

ক্রিকেটারদের মতো আম্পায়ারদের ক্যারিয়ারেও নানা উত্থান পতনের গল্প রয়েছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজে ২০০৭ বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ শেষ হতে বিলম্বিত হয়েছিল আম্পায়ারদের সিদ্ধান্তের কারণে। সেই ম্যাচে চতুর্থ রেফারি হিসেবে ছিলেন বিলি বাউডেন। শাস্তি স্বরুপ সেই ম্যাচের সকল ম্যাচ অফিশিয়াল আইসিসির পরবর্তী বৈশ্বিক আসরে ম্যাচ পরিচালনা থেকে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন। ২০১৩ সালে আইসিসির এলিট প্যানেল থেকে বাদ পড়েছিলেন বিলি। তবে সে জায়গা পুনরুদ্ধার করতে এক বছরের বেশি সময় নেননি তিনি।

তবে ২০১৬ সালের ১৬ জুন শারীরিক ফিটনেসের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আম্পায়ারিং থেকে বিলিকে অপসারণ করে নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট। আর ক্রিকেট বিশ্ব বিদায় জানাই এই জনপ্রিয় আম্পায়ারকে। বিদায় বিলি ভাল থাকবেন। জন্মদিনের শুভেচ্ছা আপনাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *